Thursday, November 17, 2016

স্বর্গীয় রমণীয় - ১৩ "রাস, c/o ভাগবত"



"তোমরা আমাকে ভালোবাসা দাও, আমি তোমাদের ভালোবাসা দিব" কানুদা এমনটি বলতেন। আমজনতাকে অবিশ্যি নয়। গোপিনীদের। গোপবালারা এক সে বড় কর এক সুন্দরী, অদ্বিতীয়া প্রেমিকা আর সারাক্ষণ কৃষ্ণপ্রেমে হাবুডুবু খাওয়া বৃন্দাবনের কিছু রমণী। এই বৃন্দাবনের গোপবালারা ভক্তিযোগে কানুকে পাবার জন্য আমরণ চেষ্টা করে গেছেন। রাধার সাথে কানুর পিরীতি তাদের বুকে শেল হয়ে বাজত। রাধা একাই কেন পাবে কানুকে? তাদের যুগলে দেখতে পেলে ঝলসে যেত গোপিনীদের চোখ, ফেটে যেত বুক। এহেন কূটনৈতিক কানু যাদবের চিন্তা হল। এত কষ্টের তৈরী ব্র্যান্ড। যুগে যুগে সেই ব্র্যান্ডকে বাজিয়েই চলেছে আম আদমী। কিন্তু বৃন্দাবনের গোপিনীরা কানুর পিরীতি থেকে বঞ্চিত থেকে যদি সেই আদি অনন্ত দুধ সাদা ব্র্যান্ডে কালি ছিটিয়ে দেয়? অগত্যা মধুসূদন। কানু যাদব ফন্দী আঁটলেন। শারদীয়া উত্সবের পরপর আম আদমীর মনখারাপ থাকে।গোপিনীদেরো ঘরের কাজকর্মে একটু ঢিলাঢালা ভাব থাকে। উত্সবের হ্যাঙ ওভার কাটতে না কাটতেই কার্তিকের পূর্ণিমায় আয়োজন করবেন রাস উত্সব... এই ছিল প্ল্যান। তিনিই স্বয়ং ইভেন্ট ম্যানেজার। c/o ভাগবত !

অতএব সতীলক্ষ্মী সব গোপিনীদের সঙ্গে কানুদার একান্তে গেট টুগেদার হল রাসলীলা। আর তাই তো কানুদা হলেন রাসবিহারী। এ হল দ্বাপরের বেত্তান্ত। তারপর কলিতেও সেই ট্র্যাডিশন অব্যাহত। বৃন্দাবনের আনাচেকানাচে কানুগত প্রাণ গোপিনীদের হৃদয়যন্ত্রে সেদিন বেজে উঠেছিল ভালোবাসার সেই সুর যা এখনো হৃদয়ঙ্গম করছেন সারা দেশের মানুষ। অতএব কানুদার রাধার সাথে পরকীয়ায় নিজের দাপুটে ব্র্যান্ডে কেউ কালি ছেটাতে পারেনি।

ঠিক যে মূহুর্তে গোপিনীরা "নাহ্‌, ঐ বাঁশী শুনে আর কাজ নাই" ভাবল তখনি কানুদা রাসলীলার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করলেন। মানে একপ্রকার গোপিনীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেই বসলেন বিচক্ষণ কানুদা। আগে বাজাতেন ভৈরবী, ইমন, শুদ্ধ বিলাবল, ভূপালী এইসব রাগ-রাগিনী। এখন বাজালেন আহির ভৈরব, পুরিয়া ধ্যানেশ্রী, আশাবরী ...যত করুণ রসে সিঞ্চিত সুরের ঝর্ণা তত‌ই পাগলপ্রায় গোপিনীদের অবস্থা। অভিসারের কথা না জানিয়েই ছুটে যেতে ইচ্ছে হল প্রাণ। সবকিছু দিতে ইচ্ছে হল কানু-দয়িতের জন্যে।

কেউ তখন দুধ দুইছিল, কেউ দুধ জ্বাল দিচ্ছিল, কেউ রাঁধছিল খিচুড়ি। কেউ নিজের সন্তানকে দুধ খাওয়াতে ব্যস্ত ছিল। কেউ স্বামীকে দফতরে পাঠানোর জন্য দেখভাল করছিল। যে যেমন অবস্থায় ছিল ঠিক তেমন অবস্থায় সবকিছু ফেলে রেখে ছুটল সেই বাঁশীর পিছুপিছু।

"কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো, আকুল করিল মন-প্রাণ"

একজন গোপিনী স্নানের পর চন্দন দিয়ে অঙ্গরাগ করতে ব্যস্ত ছিল। একজন পরছিল কাজল। একজন সবেমাত্র কাঁচুলি পরেছে, ভুলে গেল উত্তরীয় পরিধানের কথা। একজন আবার এক কানে কুন্ডল পরেই দৌড়ল। "উথালিপাথালি ওদের বুক, মনেতে নাই সুখ রে, আমায় ডুবাইলি রে, আমায় ভাসাইলি রে"

লাজলজ্জা বিসর্জন দিয়ে কানুর কুঞ্জবন রূপ বৈঠকখানায় ছুটল তারা।

চুলোয় যাক্‌ সংসার! রসাতলে যাক স্বামী-পুত্র! "রইতে নারে, বাঁশীতে ডেকেছে যারে"

বাঁশীওয়ালার ডাকে সাড়া দিয়েও বিপদ হল গোপিনীদের। কানু বাঁশীওয়ালা পরীক্ষা নেন সতত‌ই। গোপিনীরা পূর্ণিমার রজতশুভ্র জ্যোত্স্নায় বৃন্দাবনের কুঞ্জে এসেছে সব ছেড়েছুড়ে। এর মধ্যে কে কানুকে সত্যি ভালোবাসে আর কে লোক দেখানো সেটা যাচাই করতে তিনি বললেন, ভয়ঙ্কর রাতে, বনে বাদাড়ে হিংস্র বন্যপ্রাণী আছে। অতএব তোমরা ঘরে ফিরে যাও। গোপিনীরা বলল, চাঁদের আলোয় আঁধার তো দিন হয়েছে আর বৃন্দাবনের জন্তু জানোয়ার বন্ধুপূর্ণ অতএব আমরা আজ ফিরবনা এরাতে। কানুদা আবারো বললেন, তোমাদের পরিবারের লোকেরা কি বলবে? তাদের অহেতুক চিন্তা বাড়িওনা। কিন্তু গোপিনীরা নারাজ। "রহিল মোর ও ঘর দুয়ার".... কেষ্টারে লয়েই থাকবেন তেনারা।

নিজেদের মধ্যে তারা বলাবলি করতে লাগল" আজ সব ছেড়ে চলে এলাম তার জন্যে, আর এখন কিনা তিনি বলছেন ফিরে যেতে?" এদিকে প্রেমের অনুঘটক রূপে কাজ করল কার্তিকের মৃদুমন্দ হিমেল বাতাস, আকাশে রূপোর থালার মত পূর্ণচন্দ্র, আর ভেসে এল নানা ফুলের গন্ধ।

দিশেহারা হয়ে গেল সতীলক্ষ্মী গোপিনীরা। তন্ময় হয়ে গেল কানুচিন্তায়। ভুলে গেল দেহ-গেহ। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে তারা একদৃষ্টে চেয়ে কেমন যেন সম্মোহিত হয়ে গেল একে একে। কানুর রূপ, বাঁশীর সুর, প্রেমের অনুকূল প্রকৃতি সবকিছু মিলেমিশে একাকার তখন। তাদের পরপুরুষের হাবভাব, চালচলন, চটূল হাসি, অকপট অনুরাগ, মধুর বাক্যালাপ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগে ব্যস্ত তারা।

"ভিতর বাহিরে, অন্তর-অন্তরে আছো তুমি, হৃদয় জুড়ে"

তারা যারপরনাই হারিয়ে ফেলল নিজ নিজ পৃথক সত্ত্বা। প্রগাঢ় প্রেমে বুঝি এমনটিই হয়ে থাকে। পাগলপ্রায় গোপিনীরা উচ্চৈস্বরে গাইতে লাগল গান... "হরিনাম লিখে দিও অঙ্গে"



 কানুর দুষ্টুমি শুরু হল তখন। অশোক, নাগকেশর, চাঁপা গাছের আড়ালে চলে গিয়ে পরখ করতে লাগলেন তাদের প্রেমের আকুতি। লুকোচুরি চলল কিছুক্ষণ। কানুর প্রিয় ছোট ছোট ফুলগাছ, কুর্চি, মালতী, জাতি। এদের কাছে গিয়ে গোপিনীরা জিগেস করল তারা... কানুকে দেখেছ ?

এভাবে চলল কিছুক্ষণ। অবশেষে বৃন্দাবনের তরুলতার মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে তারা লক্ষ্য করল কানুর খালিপায়ের ছাপ। ওরা ভাবল আবারো বুঝি কানু সেই রাধার সাথে দেখা করতে চলে গেছে। খুব অভিমান হল তাদের। হঠাত তারা দেখল কিছুদূরেই রাধা মূর্ছিত হয়ে পড়ে আছে। তা দেখে চক্ষুকর্ণের বিবাদ ভঞ্জন হল গোপিনীদের। সখীদের সেবায় রাধার জ্ঞান ফিরল। তাকে নিয়ে গোপিনীরা চাঁদের আলোয় যতদূর পর্যন্ত যাওয়া যায় ততদূর গেল। তন্ন তন্ন করে খুঁজল কানুকে। তবু তার দেখা নাইরে। তার দেখা নাই। তারপর কানুর স্তুতি শুরু হল।

তারপর কিছুটা মান-অভিমানের পালা। যার জন্য আমাদের সব ছেড়ে চলে আসা, যার বাঁশীর শব্দে আকৃষ্ট হয়ে আমরা এই গভীর বনে চলে এলাম, যার কষ্টে আমরা এতদিন কষ্ট পেলাম, যাকে ভালোবেসে আমরা সকলের কাছে খারাপ হলাম সেই কানু কিনা আমাদের বুঝলনা? অতএব কানু একজন শঠ ব্যক্তি। তিনি মিথ্যাচার করেছেন। তিনি কপট। কানু বেচারা তখনো ইনভিজিলেটরের ভূমিকায়। পরীক্ষা তিনি নিয়েই চলেছেন।

আচমকা অতর্কিতে কানু বেরিয়ে এলেন বনের মধ্যে থেকে। গলায় বনমালা আর পরণে পীতাম্বর পট্টবস্ত্র। আকস্মিক মৃত সঞ্জীবনীর কাজ হল। গোপিনীরা প্রাণ ফিরে পেলেন যেন। এবার শুরু প্রকৃত লীলার ।

সংস্কৃত গোপী শব্দটির অর্থ হল রাখালি বালিকা যাঁরা গো-সেবা করেন। কেউ বলেন গোপিনী, কেউ আবার বলেন গোপীকা। এঁরা হলেন ভক্তিমার্গে বিচরণকারী ব্রজের রমণী। এদের মধ্যে অন্যতম হলেন কৃষ্ণের একশো আটজন সখী...এঁরা হলেন বৃহত্তর বলয়ের নিবিড় সাথী... চন্দ্রাবলী এঁদের মধ্যে অন্যতম। আরো নিবিড়তর বলয়ের অষ্টসখী হলেন চম্পকলতা, চিত্রা, ইন্দুলেখা ,রঙ্গদেবী, সুদেবী, তুঙ্গবিদ্যা, ললিতা, বিশাখা.......। আর সবচেয়ে কাছের এবং অন্যতমা হলেন শ্রীরাধিকা। শ্রীকৃষ্ণচরিতামৃত অনুযায়ী সব মিলিয়ে বৃন্দাবনে তখন কৃষ্ণের সাথে ষোলোহাজার গোপিনী সঙ্গ করেছিলেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার দূত ছিলেন তাদের প্রভুর। কেউ কেউ ছিলেন পরিচারিকা বা সেবাদাসী।

শ্যামলী তার চন্দনচর্চিত বাহুদুটি দিয়ে কানুকে জড়িয়ে ধরল। চন্দ্রাবলী বিনয়ের সাথে হাতজোড় করে প্রেমের পরিচয় দিল। শৈব্যা অঞ্জলিপুটে কানুর চর্বিত পান গ্রহণ করল।পদ্মাবতী নিজের বুকের মধ্যে কানুর চরণযুগল রাখল । ললিতা অনিমেষ নয়নে কানুর শ্রীমুখ দর্শন করতে করতে বিহ্বল হয়ে পড়ল। বিশাখা কানুকে নিজের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠা করে চোখ বুঁজে পরম তৃপ্তি লাভ করল। আর যে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে যে কানু আমার, আমি কানুর ন‌ই সেই রাধিকা অভিমানে ক্ষোভে ফেটে পড়ল। বৃন্দার কানুকে দেখে পাগলপ্রায় অবস্থা। বিদ্যুত্লতার মত দেহবল্লরী নিয়ে চম্পকলতা স্থানুবত দাঁড়িয়েই র‌ইল। কখন প্রভু কৃপা করে তার হাতটা ধরবেন একটু! একটু হবে স্পর্শসুখ। বহু প্রতিক্ষীত একটুকু ছোঁয়া লাগা স্মৃতি নিয়ে ফিরে যাবেন আবার গৃহকাজে।

অতঃপর প্রাণে খুশীর জোয়ার এল। কেঁপে কেঁপে উঠল গোপবালারা। সায় দিয়েছে কানুর মন। বিরহের অবসান হল। দেবতারা বিমানে চড়ে উপস্থৈত হলেন স্বর্গলোকে। পুষ্পবৃষ্টি হতে লাগল। দুন্দুভি বেজে উঠল। রাসমন্ডল শতশত ব্রজবালার নূপুরের সিঞ্জিনী, বলয়ের কিঙ্কিনীতে তোলপাড় হতে লাগল। এ যেন এক স্বর্গীয় লীলাখেলা। সকল গোপিনীরাই অনুভব করল যে কানু তাদের দুহাত দিয়ে কন্ঠ আলিঙ্গন করছেন। নিজের মহিমাবলে কানু তখন একই অঙ্গে বহুকৃষ্ণে লীলা করতে লাগলেন তাদের সাথে। প্রত্যেকেই খুশি তখন। সম্মোহন শক্তিতে আপ্লুত তারা। সকলের মনে হল কৃষ্ণ শুধু তার্, আর কারো নয়। নিজের নিজের কাছে প্রিয়তমকে দেখে সকলেই উদ্বেলিত তখন। ব্রজবালারা কটিবন্ধের চাদর কষে বেঁধে নিলেন। কঙ্কন-বলয়ে রোল তুলে, মল-নূপুর, বিছুয়া বাজিয়ে উদ্দাম নৃত্য করতে লাগলেন সেই একমেবাদ্বিতীয় কৃষ্ণকে ঘিরে। গাইতে লাগলেন শ্রুতিমধুর গান। কানু নিজের গলা থেকে মল্লিকাফুলের মালা ছুঁড়ে দিলেন গোপিনীদের দিকে। দীর্ঘায়ত হল সে রাত। নক্ষত্রমন্ডল রাস দেখতে দেখতে বিস্মৃত হল অস্ত যেতে।

এখন আমাদের প্রশ্ন হল শ্রীকৃষ্ণ কেন পরস্ত্রীদের সাথে এহেন পরকীয়ায় লিপ্ত হলেন? আদৌ কি এ পরকীয়া প্রেম না কি অন্যকিছু? না কি দেবতা বলে তাঁর সাতখুন মাপ? ভাগবত অনুযায়ী তিনি মায়ায় বশ করেছিলেন। নিজের সাথেই নিজে খেলা করেছেন। যে ব্যক্তি শ্রদ্ধাশীল হয়ে তাঁকে একান্ত আপনার করে পেতে চায় তাঁর সাথে তিনি এমন লীলাই করেন। গোপবালারা উপলক্ষ্য মাত্র। শ্রীধর স্বামী তো বলেইছেন

"রাসলীলায় শৃঙ্গাররস ছলনামাত্র। আসলে এই লীলা মুক্তিপ্রদায়িনী।" আর তাই তো তিনি এখনো বৃন্দাবন তথা সমগ্র বিশ্বের একমেবাদ্বিতীয় ব্র্যান্ড এম্বাস্যাডার!!!

Tuesday, November 1, 2016

রমণীয় ভাইফোঁটা

স্বর্গীয় রমণীয় (৪)
ভাইফোঁটা

কার্তিকের শুক্লা প্রতিপদ কিম্বা দ্বিতীয়া । নরকাসুর বধ করে কেষ্টাদা সবেমাত্র ফিরেছেন ঘরে। বোন সুভদ্রা দাদার মুড বুঝে নিল চটপট। আগের দিন দেওয়ালির রান্নাঘর থেকে ঘিয়ের গন্ধ তখনো পুরোপুরি যায়নি চলে। রান্নাঘরে গিয়ে দুখানা মুচমুচে নিমকি, গোটাকতক ম্যাওয়া কুচোনো লাড্ডু, সোহন পাপড়ি আর এক ভাঁড় রাবড়ি এনে দাদার মুখের সামনে ধরল। কেষ্টদা তো মহা খুশি। একে মিশন সাকসেসফুল...দুষ্কৃতের বিনাশ করে সাধুদের পরিত্রাণ করতে চলেছেন বলে মহা ফূর্তি মনে আর দুই দেওয়ালির সুহাগ রাতে অগণিত গার্লফ্রেন্ডকে সাথে নিয়ে ছাদে গিয়ে কখন ফষ্টিনষ্টি করবেন সেই অহ্লাদে ভরপুর তাঁর মেজাজ। বিদ্যুতলতারা সকলে শৃঙ্গারে ব্যস্ত তখন। কেউ কেতকী-কুর্চি-কদম্ব প্রলম্বিত জলে স্পা নিচ্ছেন। কেউ আবার কর্পূর-কেওড়া-অগরুর জলে গাত্রমার্জনা করে সুগন্ধা হচ্ছেন। কেউ ধূপের ধুনোয় কেশ শুষ্ক করে ফুলের মালা জড়াতে ব্যস্ত।


কেষ্টদার দুই গৃহিণী সত্যভামা আর রুক্মিনী বৌদির মেজাজ একটু ক্ষেপে আছে আজ। একে বহুদিনের অদর্শণে প্রাণের ভেতরটা আঁকুপাঁকু অন্যথায় আসামাত্র‌ই ননদিনী সুভদ্রা কেষ্টদাকে চিলের মত ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়ে গেল তাদের কাছ থেকে। তারপর যদিও ননদিনী ছাড়বে তাদের কর্তামশায় তো এবার যাবেন ছাদের ওপর কিম্বা নদীর তীরে। একে কার্তিকের আকাশে রাসপূর্ণিমার হাওয়া ব‌ইল বলে !

সুভদ্রা বলল, দাদা মনে আছে কালকের কথা? এবারে কিন্তু আরো বড় উপহার চাই। ঐ ময়ূরের পালক, কদমফুলের আর্মলেট আর জাঁতিফুলের মুকুটে কিন্তু চলবেনা বলে দিলাম। এবার ডাবল ধামাকা কিন্তু। একে ভাই ফোঁটা তায় নরকাসুর বধ হয়েছে। অতএব ট্রিট চাই বস!

কেষ্টাদা মুখটা বেঁকিয়ে বললেন, তা আমাকেই বা কেন বধ করা বারেবারে? আরো একজন দাদাও তো আছে নাকি। সুভদ্রা বলল, তুমি তো গেছ নরকাসুর নিধন করতে। বলরাম দাদা? তিনি তো দ্রাক্ষারসে অবগাহন করে পড়ে রয়েছেন সেই ধনতেরস থেকে।


কেষ্টাদা প্রমাদ গনলেন। চটপট স্মার্টফোনে দেখে নিলেন ব্যাংকে কিছু পড়ে আছে কিনা। সুভদ্রাকে বললেন, ঠিক হ্যায় তব। মানাও ভাই দুজ, ঘটা করে ভাইফোঁটা হোউক! !!!


রুক্মিনী, সত্যভামা বৌদিদ্বয় শশব্যস্ত হয়ে গাত্রোত্থান করে বাজারের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালেন।হাজার হৌক রান্নাবাটিতো তাদেরি করতে হবেক। আরতো সকলে সুখের পায়রা! যদি আবার নন্দাই বাবু অর্জুন এসে পড়েন তাহলে আর কথাই নেই! জামাই বলে কথা! বৌদিরা আবার নন্দাইকেও ভাইফোঁটা দেয়।j

Saturday, August 20, 2016

আবার সে এসেছে ফিরিয়া

চাদ্দিকে যা রম্যের ঘটা, তাই কলম ধরতে ভয় যদি না হাসে পাঠক আমার ? তবুও লিখতে হয়। এই ধরুন মাগ্যির ম্যাগি নিয়ে যা কান্ডটি হল! আমি কোথায় ভাবছিলাম মিডডে মিলে ম্যাগি চালু হল বলে! ম্যাগি তো হল গিয়ে বাচ্ছাদের স্টেপল ফুড এখন। ব্যস্ত গৃহিনী, চাকুরে গৃহিণী, রুগ্ন গৃহিণী, রান্নার মাসীর অনুপস্থিতিতে ল্যাজে গোবরের গৃহিণীর পরম আদরের বন্ধু হল গিয়ে ম্যাগি। স্থলে, জলে, অন্তরীক্ষ্যে, এভারেস্টের মাথা থেকে কন্যাকুমারীকার জলে যেখানে যাবে কাপ্-ও-নুডলসের খাপ কিম্বা ম্যাগির পরিচিত হলদে প্যাকেটটি পেয়ে যাবে। তা না দেখি আমার প্রিয় ম্যাগির নামে কত কেচ্ছা! মোনো সোডিয়াম গ্লুটামেট আছে তাতে, লেড আছে তাতে! আরে থাকুকনা মশাই! কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরোতে পারে! জানেননা? আজ যে রাজা কাল সে ফকির। চিরদিন, কাহারো সমান নাহি যায়! আজ যে সিবিআইয়ের ফাঁদে কাল সিবিআই যে তার ফাঁদে পড়বেনা কে বলতে পারে? এফ এম সি জির দলদাস আমরা কি বাপু অতশত বুঝি? আমাদের যেমন চালাও তেমন চলি। আমরা যন্ত্র, মিডিয়া আমাদের যন্ত্রী। মোদের যেমন নাচাও, মোরা তেমনি নাচি । ধরুণ ম্যাগিকান্ডের কোপ এবার গিয়ে সোজা পড়ল পাড়ার ফুচকার ফ্যাক্টরীতে অথবা আইসক্রিমের এঁদোগলিতে। ফুচকার জলে নাকি মশার লার্ভা থেকে শুরু করে পুকুরের জল পর্যন্ত থাকে। পুকুরের জলে শৌচকর্মের বীজাণুরা দিব্যি হেসে খেলে বেড়ায়। সস্তার আইসক্রিম নাকি ড্রেনের জলে তৈরী হয়। তাতে জলজ্যান্ত স্ট্যাফাইলোকক্কাসরা দিব্যি বেঁচেবর্তে থাকে দিনের পরদিন আর হিম-সাগরে অবগাহন করে তাদের নাকি মা-ষষ্ঠীর কৃপায় দিব্যি বংশবিস্তার চলতে থাকে। একটু গরমে এলেই ওরা ক্ষমতা দেখায়। গলায় ব্যথা, কাশির অব্যর্থ জীবাণু রূপে রোগসংসারে ওদের খুব নামডাক । ম্যাগিকান্ডে না হয় একটা মাল্টিন্যাশানাল বাঁশ খেল কিন্তু ফুচকায় হাত দিলে কিম্বা ঐ ফুটপাথী আইসক্রিমে হাত দিলে বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা। এক ঘা পড়বে ফুচকাওলার ঘাড়ে। এক ঘা পড়বে লোকাল দাদার ঘাড়ে। এক ঘা পড়বে স্থানীয় কাউন্সিলারের ঘাড়ে। আর বাদবাকী পনেরোটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ার আগেই সেখানকার যত ডাক্তারবাবুরা আছেন তাঁরাই ব্যাপারটাকে চাপা দিয়ে দেবেন। কারণ? কারণ রোগী বিনা ব্যাবসা নাই, ডাক্তারবাবুর ঘুম নাই। অতএব ফুটপাথী ফুচকা ও আইসক্রিম চলতেই থাকবে। লোকাল দাদা আর কাউন্সিলর সাহেবকে ঐ ডাক্তারবাবুরাই ম্যানেজ করে দেবেন। লোক দেখিয়ে দিনকয়েক ফুচকাওলা অন্য পাড়ায় গিয়ে দাঁড়াবে। আইসক্রিম ওয়ালা দুকুরবেলায় না বেরিয়ে সন্ধ্যের ঝুলে আইসক্রিম বিকোবে আর ড্রেনের জলে, পুকুরের জলে চুন ছড়িয়ে কাউন্সিলার সাহেব মাইক হাতে বলবেন" ব্লিচিং পাউডার ছড়িয়ে দেওয়া হল সর্বত্র অতএব আজ থেকে পত্রপাঠ মশার লার্ভা, স্ট্যাফাইলোকক্কাস অন্তর্হিত হল এই এলাকা থেকে।" কানেকানে মাইক সরিয়ে ফুচকাওলাকেও বলে দেওয়া হল, যেমন চলছে চলুক। "তোমরা আমাকে তোলা দাও, আমি তোমাদের ফুচকা বেচতে দেব"। ডাক্তারবাবু মহাখুশিতে তাঁর ছাদের ওপর গভীররাতের নৈশভোজ ডাকলেন। সে যাত্রায় ফুটপাথী ফুচকা আর আইসক্রিম রক্ষে পেল। হোয়াটসএপ থেকে ফেসবুক সর্বত্র ম্যাগি নিয়ে জোকের ছড়াছড়ি। আরে মশাই ম্যাগি তো সলমন খানের চেয়েও বড় সেলেব। ঐটুকুনি হলদে প্যাকেট আর অত্তখানি স্বাদে ভরা, সুবিধেয় ঠাসা একটা মাল! ছোট্ট ছেলেটা স্কুল থেকে এসে বলল, মা! ম্যাগি ছেলে না মেয়ে বলতো? মা আবার "মাগী"র সাথে ম্যাগির নৈকট্য বুঝে উত্তর দিলেন "মেয়ে" ছেলে বলল, "হলনা, ওতো দু'মিনিটে তৈরী হতে পারে, তাই ম্যাগি হল ছেলে, ইয়ে! মাই ফেভারিট ম্যাগি! আমার ম্যাগি চাই-ই, ব্যস! আমিও ছেলে, ম্যাগিও ছেলে" ছেলের বাবা বলল, "আর সত্যি যদি লেড থাকবে তাহলে সারাদেশের ছেলেরা আজকে সলমনের মত মাসল ফুলিয়ে নটরাজ-বন্ডেড লেড, এইচবি" আর মা সেই শুনে বলল, "তাহলে মেয়েরা অত সীসা হজম করে নিশ্চয়‌ই অপ্সরা, এক্সট্রা ডার্ক, ঠিক যেন ব্ল্যাক বিউটি কৃষ্ণকলি!” মোড়ের মাথার চায়ের দোকানে ম্যাগি বিতর্কে সামিল হলেন ভোলাদা আর শিবুদা। ভোলাদা বললেন, "যাই বল আর তাই বলো ম্যাগি একদম বন থেকে বেরোল টিয়ে, সোনার টোপর মাথায় দিয়ে। ভিনিভিডিভিসি করে আজ নুডলস দুনিয়ায় তার মত পপুলার কেউ নেই। আমার মনে হচ্ছে ঐ এম-এন-সি মানে, যারা ম্যাগি তৈরী করে তাদের সাথে ডাক্তারবাবুদের ষড় আছে। নতুন নতুন রোগের সন্ধানে ব্যস্ত থাকেন তারা। হাঁচি-কাশির যুগ শেষ হয়ে ডিপথিরিয়া-টিবির যুগ ফুরোল। এডস-হেপাটাইটিস নিয়েও মানুষ যথেষ্ট সচেতন এখন। তাই নতুন কিছু ভাবনা নিয়ে হাজির হতে হবে । মিলেনিয়ামের পনেরো বছর নতুন কিছুই এগোয়নি আর। কেবল "তারে জমিন পর", "পা", "মাই নেম ইজ খান" অথবা "ফিফটিন পার্ক এভিনিউ" ছাড়া ! অতএব চলো, কুছ করকে দেখানা হ্যায়। জাপানের মিনামাতা উপসাগরে বিষ পড়ায় মাছেদের মৃত্যু ও তা থেকে মানুষের মৃত্যু হয়ে গেল গেল রব উঠেছিল। সেখানেও সীসা ছিল মধ্যমণি অতএব চলো লেড পয়জনিং নিয়ে মাতামাতি কাম আন্দোলন করি আমরা। প্রথমে আমরা ক্ষেপিয়ে বেড়াই ম্যাগি নিয়ে । তারপর ঝড় থেমে গেলে আবালবৃদ্ধবনিতাকে পুছতাছ করে তার লেড পয়জনিং আদৌ হল কিনা দেখি কিছু টেষ্ট করে। তারপর বাজারে এই রোগ নিয়ে কিছুদিন উত্তেজনা চলবে। মিডিয়া বলবে। মানুষ ভয় পাবে। তারপর চারদিকে পাড়ায় পাড়ায় লেড পয়জনিং এক্সপার্ট ডাক্তারবাবুর ক্লিনিক চালু হবে। যেমন হযেচে "ইনফার্টিলিটি এক্সপার্ট', "ওবেসিটি এক্সপার্ট", "এনোরেক্সিয়া এক্সপার্ট" ..তেমনি আরকি!লেড পয়জনিং বা যার গালভরা নাম "প্লাম্বিজম" অথবা আরো বড়সড় নাম "কলিকা পিক্টোরিয়াম" বাবুদের চেম্বারে দেখলে রোগীরাও সচেতন হবে। হাজারো গন্ডা টেষ্টক্লিনিকে নতুন টেষ্ট হবে। নতুন রোগ মানেই নতুন জনকারী। নতুন জনকারী মানেই শোরগোল। অতএব সে যাত্রায় মনে হচ্ছে ম্যাগি পার পেয়ে যাবে। তাই ম্যাগির ভাগ্য নির্ধারণ করবেন মাননীয় ডাক্তারবাবুরা। একটু আধটু লেডও থাকুক। আজিনামোটোর ছোঁয়াও থাকুক। বেঁচে যাক এমএনসি। বেঁচে থাক ম্যাগি। বেঁচে যাক ছেলেবুড়ো ! সার্জেনরা কিন্তু মুষড়ে পড়েছে বড়। ম্যাগি না খেলে বেরিয়াট্রিক সার্জারী বন্ধ হয়ে যাবে। দিব্যি ম্যাগির ফ্যাট হজম করে বাচ্চাগুলোর ওবেসিটি হচ্ছিল, সার্জেনরা বছরে অন্ততঃ দুটো হলেও কেস পাচ্ছিল।" শিবুদা বললেন, "এবার থামবেন ভোলাদা? আমাকে কিছু বলতে দেবেন্?” "দুটো ব্যাপার আছে আমার মনে হয়। সরকার বলচেন, দেশে যে হারে আলুচাষী, গমচাষীরা আত্মহত্যা করছে তার অন্যতম কারণ হল গম, আলু এসব বিক্রি পড়ে যাওয়া। মানুষ ডাল খায়না আর। ডালের দাম বেশি তাই। ভাত-রুটি-ডাল খাওয়া কমে যাচ্ছে তাই সরকারের হঠাত মনে হয়েচে ম্যাগি হল যত নষ্টের গোড়া। মানুষ ম্যাগি বেশি খাচ্ছে তাই ম্যাগির ব্যবসা লাটে ওঠাও। আর সরকারী কোঁদল চাপা দিতে কি ওষুধ লাগে জানেন তো ভোলাদা? শুধু ঠিক জায়গাটায় ঐ কোম্পানী তার দেয় অঙ্কটা মিটিয়ে দিন, এই আমার ঐকান্তিক ইচ্ছা।" কলেজের এক প্রোফেসরের নামটাই দিয়ে দিলাম "ম্যাগি" কারণ ওনার মুদ্রা দোষ। ওনার বোরিং লেকচারে ব্যতিবস্ত হয়ে আমরা "আর কতক্ষণ" ম্যাম জিগেস করলেই উনি শুধাতেন "টু মিনিটস" ! আমরা ওনার নাম বদলে দিয়ে রাখলাম "ম্যাগি" সেই ব্র্যান্ড আজ বিপর্যস্ত। সেই সুখ আজ অসুখে পরিণত। সেই হলুদ প্যাকেট আজ বিতাড়িত। সলমন খান অত বড় দোষ করে পার পেয়ে গেল আর ম্যাগির নামে যত্ত দোষ! আরে মশাই জ্বরে গা পুড়ে যাওয়া বাচ্চার ম্যাগি খেয়ে অসুখ বেড়ে গেছে বলে তো শুনিনি কখনো। একশো গ্রাম ম্যাগি আধখানা পেঁযাজ আর একটা ডিম দিয়ে দিব্যি কমপ্লিট মিল! আর কুকিং টাইম দুমিনিট। নো হ্যাপা অফ গেটিং গ্যাস আর পেটও ভরবে জেনো, ব্যাস! অতএব বস্তিতেও স্বস্তি। হাইরাইজেও মস্তি। ম্যাগি হল ফুড দুনিয়ায় সেলিব্রিটি। আজ ম্যাগির মধ্যে এমএসজি তাই এত হুজ্জুতি তোমরা করো! তোমরা যে সব বুড়ো খোকা আর কারো দোষ দেখতে নারো! কত লোক কথা দিয়ে কথা রাখেনি তার বেলা? কত ব্ল্যাক মানির হদিশ পাওনা তার বেলা? কত করাপশান "দেবা: ন জানন্তি কুতো মনুষ্যা:”, তার বেলা? কত মামলা সুবিচার পায়না তার বেলা? কত টুপি প্রতিনিয়তঃ আমাদের পরতে হয়, অন্যতম সমাজবন্ধু ডাক্তারবাবুর দ্বারা। তার বেলা? অতএব বন্ধু গুজবে কান দিবেননা। দিন আগত ঐ ! ম্যাগি বেঁচে থাকিবে। তার জনক মিষ্টার নেসলে অত বোকা নন। তিনি জানেন এ দেশে কিভাবে ব্যাওসা পাতি করতে হয়। টু আর ইজ হিউম্যান। একটু সময় দিন কেবল। তাঁর অপত্যকে রক্ষা তিনি‌ই করিবেন, বলাই বাহুল্য।

উত্তরবঙ্গ সংবাদ ১৪ই আগস্ট ২০১৬ 

Monday, August 8, 2016

একুশে যোগ

"বিশ্বসাথে যোগে যেথায় বিহারো, সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারো" ... রবিঠাকুরের কথা। আর সেইস্থানেই তিনি খুঁজিয়া পাইলেন স্বামীজিকেও। স্বামীজি বলিয়াছিলেন জ্ঞানযোগ, ভক্তিযোগ, কর্মযোগ এবং রাজযোগের কথা। এবার উত্তিষ্ঠিত, জাগ্রত ভারতবাসী তথা সারা বিশ্বের মানুষ দেখিল চিরন্তন, শাশ্বত ভারতের ব্যায়াম যোগ। শেষমেশ রবিঠাকুর,বিবেকানন্দের আদর্শ মাথায় ল‌ইয়া স্বাস্থ্য‌ই জীবনের মূলমন্ত্র হইল। প্রথমে শৌচাগার তাহারপর ব্যায়ামাগার। অতএব প্রথমে বিয়োগচিন্তা তারপর যোগচিন্তা। না, না যোগের অর্থ জলযোগ নয় কোনোমতেই। প্রথমে স্বাস্থ্য তৈরী করা, তাহার পর "স্বাস্থ‌ই সম্পদ" এই আপ্তবাক্য মাথায় রাখিয়া "লাগো কাজে, কোমর বেঁধে, খুলে দ্যাখো জ্ঞানের চোখ, কোদাল হাতে খাটে যারা, তারাই আসল, ভদ্রলোক" । "ভারত আবার জগত সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে" কি না তাহা হইল মিলিয়ন ডলার কোশ্চেন তবে যোগাভ্যাসের এক্সোথার্মিক বা তাপনিঃসারক বিক্রিয়ার ফলে প্রচুর তাপশক্তি নির্গত হ‌ইবে । যোগাভ্যাসকে একটি তাপনিঃসারক বা এক্সোথার্মিক প্রসেস বলা যাইতেই পারে। ফলস্বরূপ প্রচুর স্নেহ ঝরিবে আকাশে, বাতাসে। চর্বি গলিবে, ঘামের দুর্গন্ধে টেঁকা দায় হইবে। সকল স্নেহ, শ্বেতসার যাইবে ব্যায়ামাগারের নয়ানজুলিতে। উহাকে সাফ করিতে রাজ্যে রাজ্যে কর্মসংস্থান হইবে । নয়ত অচিরেই দেশ আরো গরম হইয়া উঠিবে। কারণ স্নেহ অতি বিষম বস্তু। তাপ নিঃসারক। একেই বিশ্ব উষ্ণায়ণ তায় আবার মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হ‌ইতে ব্যায়ামের দরুণ যে ক্যালরি দহন হইবে তাহা কোথায় যাইবে? দেশের অভ্যন্তরেই ঘুরপাক খাইবে। শুধু দেশ নয় রাষ্ট্রপুঞ্জের অন্তর্গত দেশগুলিতেও তাপ উদ্বৃত্ত হ‌ইবে। সবকিছু চিন্তা করিয়া রাষ্ট্রপুঞ্জ বিবেচনা করিয়াছেন, পৃথিবী নামক গ্রহটির অভ্যন্তরে একটি সেন্ট্রালি কনট্রোলড এয়ার কন্ডিশানার বসাইবেন। পৃথিবীর মনুষ্যকুল যোগের সাথে ভোগ করিয়াও বাঁচিবে আর যোগাভ্যাস করিয়া বেঁচেবর্তে দিব্যদৃষ্টি লাভ করিয়া পৃথিবীকে সমৃদ্ধ করিবে। রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি বৃদ্ধি পাইবে। আমরা আরো "ভালো" করিয়া জীবনযাপন করিব। কলিযুগে মানুষ অভ্যাস করিবে কলিযোগ। সমাজের সর্বস্তরে মানুষ অনুভব করিবে নতুন যোগ। কি জানি কাহার যোগসাজসে যোগাচার্যের এরূপ যোগপ্রীতির বাণী মনুষ্যকুলে সঞ্চারিত হ‌ইল! তবে যোগাচার্যের ব্যায়ামাগারের যোগ-ঊর্মি আমাদের উভয়বঙ্গকেও ভাসাইয়া দিল সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। আমি বাপু আদার ব্যাপারী। যোগ-বিয়োগের সাথে আমার পরিচয় হ‌ইয়াছিল পাটিগণিতে। ইহা ব্যাতীত এযাবতকাল বহু যোগের সাথে যোগাযোগ হ‌ইয়াছে আমার। যোগদিবস উদ্‌যাপনে আমার ইহার পূর্বে কোনো মাথাব্যথা ছিলনা। কিন্তু যত‌ই বয়স বাড়িতে লাগিল তত‌ই বুঝিলাম যোগ না করিলে জীবনের সবটুকু‌ই বিয়োগফল। অতএব এ ব্যাপারে কারোর বিরুদ্ধে কোনো অনুযোগ বা অভিযোগও না করিয়াই সামিল হ‌ইলাম সমগ্র বিশ্ব সহ আমার দেশ, তোমার দেশের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার সহিত । যোগ না করিলে জীবন হ‌ইতে পিত্জা-বার্গার-মকটেলাদি, রোল-চাউমিন-ফুচকা-মিষ্টান্নাদি জীবন হ‌ইতে বিয়োগ দিতে হ‌ইবে। অতএব "এখন আর দেরী নয়, ধরগো তোরা, হাতে হাতে ধরগো, এবার যোগাসনে বসতে হবে, ন‌ইলে বিপদ হয়গো" যোগবলে তুমি যোগাচার্য আমি যোগমায়া। চলো, করেঙ্গে অ‌উর মরেঙ্গে। ডু অর ডাই। ভারতকে বিশ্বের দরবারে যোগ করিব আমরা। বিয়োগ করিব দ্বেষ, হিংসা। যোগবলে ছড়াইব শান্তির বাণী। অহিংসার বার্তা। হ্রাস পাইবে তোমার-আমার-সকলের মধ্যপ্রদেশ। বৃদ্ধি পাইবে হৃদয়ের উত্তরপ্রদেশ। আর যাহারা অংশ ল‌ইলনা তাহারা অচিরেই অধঃক্ষিপ্ত হ‌ইবে । "সবার পানে যথায় বাহু পসারো, সেইখানেতেই প্রেম জাগিবে আমারো ..." অতএব বাহু পসারিয়া, চক্ষু উন্মিলীত করিয়া বিশ্ববাসীর সহিত গত একুশে জুন আমরাও যুক্ত হ‌ইলাম। প্রেম বিলাইলাম। প্রেম জাগাইলাম। এক্ষণে বিশ্ব যোগদিবসের এই যোগকে আমরা কি যোগ বলিয়া আখ্যা দিব? আমার মতে ইহা স্বামীজির আরেক প্রকার কর্মযোগেরই অন্তর্ভুক্ত যাহাকে "প্রেম যোগ" বলিয়া অভিহিত করা যাইতেই পারে। কিন্তু উহাতে যুবসমাজ চিত্তবৈকল্যের হেতু ক্ষতিগ্রস্ত হ‌ইয়া পড়িতে পারে। যোগ হ‌ইল একপ্রকার সাধনা, আরাধনা, উপাসনা বা তপস্যার ন্যায় একাগ্রচিত্তের ফসল। সেখানে "প্রেম, ভালোবাসা" নৈব নৈব চ। অবশেষে রাজশেখর বসুর উদ্ভাবিত বিল্বকাষ্ঠের ল্যাঙট বৃত্তান্ত জানিতে পারিয়া বিশ্ব যোগ পরিষদ এবং জয় হনুমান একাডেমী সমগ্র বিশ্বের পুরুষগণের জন্য মাথাপিছু একটি করিয়া ঐ কৃচ্ছসাধনার ল্যাঙট অর্ডার দিয়াছেন। এবং অচিরেই কোনো এক পৃষ্ঠপোষক সেই টেন্ডারে সাড়া দিয়া ল্যাঙটের অর্ডার পাইয়াছেন বলিয়া জানিলাম । এবার প্রশ্ন হ‌ইল বিশ্বের যোগীরা ডাকযোগে সুদৃশ্য প্যাকেট সহযোগে ল্যাঙট পাইবে। ল্যাঙট পরিয়া যোগীর শরীরে ব্যথাবিষ বৃদ্ধি পাইবে। দেশবাসীর মনোযোগ সহকারে এহেন যোগাভ্যাসের দাপটে চিকিত্সকদের কিঞ্চিত ভয় হ‌ইতেছিল বটে। রোগীরা ঔষধ-যুক্ত না হ‌ইয়া মুষ্টি যোগ, হঠযোগ করিতেছিল। তাহাতে উহাদের ব্যাওসাপাতি লাটে উঠিতেছিল। বর্তমানে ল্যাঙটকান্ডে উহারা আবারো ফুলিয়া ফাঁপিয়া উঠিবেন, সেটুকু স্বস্তির নিঃশ্বাস। এবার যোগিনী বা যোগমায়ারা কি পরিবেন? বিশ্ব যোগ পরিষদ বলিল, "কেন? উহারা বল্কল পরিবে, কাঁচুলি পরিবে। মাথার কেশরাজিকে পরিপাটি করিয়া শিরের সু-উচ্চে কবরী বাঁধিবে। ঠিক যেমন আদি-অনাদি ভারতবর্ষের আশ্রমকন্যারা করিতেন" জয় হনুমান দল বলিল " উহাতে যোগভ্রষ্ট হ‌ইবে পুরুষগণ। মনোযোগের ব্যাঘাত ঘটিবে। যোগের বদলে বিয়োগ হ‌ইবে।" অগত্যা বিশ্ব যোগ পরিষদ ধার্য করিল নতুন উপায়। ঘোড়দৌড়ের মাঠে ঘোড়াদের চিত্তচাঞ্চল্য রুখিবার জন্য চোখের যেরূপ ঢাকনা ব্যবহৃত হয় তেমনটি ধারণ করিয়া পুরুষেরা যোগাভ্যাস করিবে। সেযাত্রায় যোগাভ্যাসে কোনো চিত্তচাঞ্চল্যের আভাসমাত্র পাওয়া যাইবেনা এই তাহাদের বিশ্বাস।

উত্তরবঙ্গ সংবাদ  ৩১শে জুলাই-২০১৬  

Monday, July 18, 2016

হেডাপিসের বড়বাবু

সোমবার এলেই মুখটা ব্যাজার হয়ে যায় বড়বাবুর । আবার আপিস শুরু । আপিস মানে রোজ সকলকে বেজার মুখে যেখানে যেতে হয় ! যদি সরকারী আপিস হয় আর যদি বাঙালী সেখানকার বড়বাবু হন তাহলে একটু আধটু দেরী করলে বড় একটা ক্ষতি নেই । তিনি বেলা দশটা পার করে এলেই হবে । তাঁর ক্ষেত্রে সময়ের বিশেষ ছাড় । তিনি আপিসের পাপসে দশটা বেজে দশ মিনিটে পা দেবেন তো দশটা বাজতে দশে নয়। তারপর চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে মাথা পুঁছবেন । পকেট থেকে রুমাল বের করে চশমার কাঁচ পুঁছে চিরুনিমাসীকে হাতে ধরে আয়নার সামনে যাবেন । আম-বাঙালীর মত বড়বাবুরও ভিশন খুব একটা প্রবল নয় তাই সকলের মত বড়বাবুর চশমা চোখে । এপাশের চুল ওপাশে রাখবেন খুব ধীরে সুস্থে । তারপর আফ্রিকার মানচিত্রের মত চকচকে টাকটিকে দেখে নেবেন চট করে । এবার মুখটা কুলকুচি বেসিনে । গিন্নীর দেওয়া আদরের পানের কুচোটুচো গুছিয়ে ফেলে দিয়ে টেবিলের দিকে । তখন ঘড়ির কাঁটা পৌনে এগারোটা ছুঁই ছুঁই । টেবিলে বসেই মাথা গরম । বিস্তর ফাইলের স্তূপ । ধূলোটাও ব্যাটারা ঝেড়ে দেয়না আজকাল । এবার মুঠোফোনের টুংটাং । শালী, আধা ঘরওয়ালির দুষ্টুমিষ্টি ফচকেমি.. দু-চার মিনিট । ততক্ষণে আপিসের বাইরে মামণি টি-ষ্টলের মামণি এসে চায়ের গেলাসে ঠকাস করে চা রেখে চলে গিয়েছে টেবিলে । কিছুটা চেঁচানো" বিস্কুট কৈ রে মামণি?" এই কত্তে কত্তে সাড়ে এগারোটা । এবার ফাইলের স্তূপ থেকে সীতা উদ্ধারের মত করে টেনে হিঁচড়ে একখান চোতা কাগজ বের করে তাতে নিজের নামটা স‌ই করা হল । সেই মহাযজ্ঞে আরো একটি ঘন্টা কাবার । এবার মামণির মা এসে বলে " স্যার, আজ কি খাবেন?রুটি-ডিমের কারি, পরোটা-আলুর দম না এগ-চাউচাউ?" মামণির মায়ের ঝটিতি আগমন ও প্রস্থানে কিছুটা শান্তি ও আপিসে আসার তৃপ্তি । বেঁড়ে খাবার বানায় বৌটা । বাড়িতে তো "এটা খেওনা, ওটা খেওনা".. কত্ত শুল্ক চাপানো! আর আপিসে নো কোলেস্টেরলের কচকচানি ! মামণির মায়ের হাতের গুণে সব অসুখ উধাও । শুধু সুখ আর সুখ ! ঠিক একটা বাজতে না বাজতেই মামণির মায়ের হাতে ধোঁয়া ওঠা নিত্য নতুন ডিশ! বাড়িতে তো গিন্নীর সিরিয়ালের দাপটে রান্নার মেয়েছেলেটা সাত সকালে হুড়মুড় করে রুটিটাও ক্যাসারোলে ভরে রেখে চলে যায় । আহা! মামণির মায়ের হাতের ফুলকো ফুলকো রুটিটাও কি দারুণ লাগে তখন খিদের মুখে । এবার মুখটুক পুঁচে টুচে মগজের গোড়ায় আনফিল্টার্ড ধোঁয়া দিতে একটু পাপসের বাইরে পা । একটু আড্ডা, আধটু ধোঁয়া ছাড়া । রাজনীতির কূটকচালি থেকে শেয়ারমার্কেট । চেয়ারের গদিতে ফিরে আসতে আসতে তিনটে । আবার চায়ে চুমুক, সাথে মামণির হাসিমুখ । বুদ্ধি খুলে গেলে একটু কারোর পেছনে কাঠি করা নয়ত টেবিলে মাথা রেখে ছোট্ট ন্যাপ । হার্ট ভালো থাকে এতে । বয়স তো আর কম হলনা বড়বাবুর ! চারটে বাজলেই ব্যাস্! এবারে আর কে পায়! পাপসের বাইরে পা । পাঁচটায় মেট্রোতে পা দিতে পারলে শান্তি । আর ছটায় বাড়ি ফিরেই আবার চা । এবার কালো-চা। এক টুসকি বীটনুন আর দু ফোঁটা লেবুর রস দেওয়া কেফিন। এন্টি অক্সিডেন্ট, ফ্ল্যাবোনয়েড সব আছে এই চায়ের মধ্যে । গিন্নীর বচন, খনার চেয়েও দামী । সারাদিন ধরে কাগজ আর টিভি সার্ফ করে সঞ্চিত জ্ঞানকণা ! হার্ড লাইফ বলে একে! এই কত্তে কত্তে আরো চারটে বছর পার করে দিতে পারলে ব্যাস! রিটায়ারমেন্টের পর বাড়ি বসে বসে পা নাচানো আর মাস গেলে পেনশন । সমস্যা একটাই, কারণে অকারণে গৃহযুদ্ধ । মঙ্গলবারে বড়বাবুর ফাইলের জঙ্গল সাফ করার কথা। কিন্তু সাফ করব বললেই কি আর করা যায়? সেদিন আবার মামণির চায়ের দোকানে আলু পরোটা মেলে। অফিসে গিয়েই মন উশখুশ করে কখন আলুপরোটা নিয়ে হাজির হবে মামণিসোনা। বাড়িতে সুগারের প্রকোপে আলু নৈব নৈব চ! বুধবারে বাবু কোনো ভালো কাজে হাত দেননা। কেউ কিছু স‌ইসাবুদ করাতে এলে বলেন "রেখে যাও ভাই, আজ হবেনা!" আমার জন্মলগ্নেই নবমপতি বুধ অষ্টমে বিরাজ করছে। তাই জ্যোতিষি বলেই দিয়েছিলেন বুধবারে কোনো কাজে হাত না দিতে! বিষ্যুদবার গুরুবার। বাড়ি ফেরার পথে উপোসী গিন্নীর জন্যে দৈ-মিষ্টি নিয়ে ফিরতে হয়। সকালে আপিসে এসেই সেই কথাটা বারেবারে মনের কোণে উঁকি দেয়। গিন্নী একা একা সাবাড় করে সেনমশায়ের লাল দৈ আর দেলখুশ! আর বাবু সুগারের করাল চাউনিতে চেয়ে চেয়ে তা দেখেই যান। সেই মন খারাপের জেরে সকাল থেকে কোনো কাজেই মন লাগেনা যেন। শুক্কুরবার মানেই উইকএন্ডের শুরু। আমেরিকার লোকজন কোথায় তখন ফ্রাইডে পার্টির আলোচনা করে! বাবুর আপিসে সেসবের বালাই নেই! পার্টি হলে একটু জমিয়ে নিষিদ্ধ পানীয়, মুরগী মটন পেটে পড়ার স্কোপ থাকে। সেই নিয়ে ভাবতে ভাবতে টেবিলে বসে বসে লম্বা হাই তোলেন তিনি! কে যে বলে! এই দেশেতেই জন্ম যেন, এই দেশেতেই মরি! কক্ষণো নয়! মরিব মরিব সখী নিশ্চয় মরিব । কিন্তু এদেশে আর জন্মাব না। আর শনিবারের হাফবেলাটা কোনো রকমে পার করেই বাড়ি গিয়ে মটন স্টু দিয়ে ভাত খেয়েই দিবানিদ্রা যান বাবু। অতএব আপিসে গিয়ে নতুন কোনো কাজে হাত লাগানোর কোনো কোশ্চেন নেই। কেউ কোনো মিটিং ডাকলে বাবু বলেন, বারবেলায় মিটিং নাস্তি। এভাবেই কাটে হেড আপিসের বড় বাবুর সাপ্তাহিক আপিস ভ্রমণ । তিস্তার জল বয়েই চলে আপন খেয়ালে। নেপালের মাটি চিড় খায়। সলমনের মামলায় রায় হয়। হৃত্বিকের ডিভোর্স হয়। সানিয়াকে টপকে যায় সাইনা। আইপিএলে কেকেআর ইডেন কাঁপায়। বাবুর পত্নী মদনগোপালের পুজো করে চলেন মমতাভরে। বাবুর টেবিলের ফাইল লালকুঠি থেকে নবান্নের নীলকুঠিতে যায় কয়েক ক্রোশ পথ ঠেলে। বাবুর বদল হয়না। সোম থেকে শনি এক‌ইরকম কাটে। কখনো মেঘ, কখনো বৃষ্টি। কখনো রিসেশন, কখনো ইনফ্লেশন। কখনো পরিবর্তন কখনো প্রত্যাবর্তন । কখনো লাল কখনোবা নীল ফিতের ফাইলে বিশেষ চিঠি আসে বাবুর টেবিলে। বাবু প্রমোশন পান এভাবেই ।
উত্তরবঙ্গ সংবাদ ৭ ই আগষ্ট ২০১৬

Thursday, July 14, 2016

স্বর্গীয় রমণীয় (১২) --- উল্টোরথে সোজাকথা


"মার আবার উল্টো আর সোজা, রথ এলেই আমার কাজ বাড়ে"   ঐ আবার বিমলি পিসির বিলাপ শুরু হল।
মন্দিরের ভেতর লক্ষ্মীমাসীর এই কটাদিন বেশ ঢিলেঢালা ছিল কাজেকম্মে। দেখতে দেখতে এগিয়ে এল সেই দিন! মন্দিরের বাইরে এসে চেঁচিয়ে বলল লক্ষ্মীমাসী,
"দিদি গো, হয়ে গেল আমাদের গল্প করা। এবার কাজ করতে করতে পরাণ বেরিয়ে যাবে গো দিদি"  
বিমলিপিসি বলল, "কেন তোর তো খুব ভাল লাগে ওনার সেবাটেবা করতে। ঐ নিয়েই পড়ে থাক সারাটা জীবন" 
"দিদি অমন বোলোনা। উনি বহুরূপী। আজ পুণর্যাত্রা। মাসীর বাড়ি গেছেন সবেমাত্র আটদিন। যেতে না যেতেই মন উচাটন দিদি। তোমার হয়না এমন?"   
"হলেই বা কি ! উনি কি আর আমার জন্যে ভাবেন? ওনার তুমি হলে কিনা খাস সুয়োরাণী। তারপর আছেন সেই মাসী আর বোন। তাদের জন্যে ভাবতে ভাবতে আমার কথা ভাববার আর সময় ক‌ই? তা বাপু, মাসীর বাড়ি গেছ ফূর্তি করতে, আরো কটাদিন থাকলেই তো পারতে! বুঝিনা কি আর? যদি পুরীর মন্দিরের সব ক্ষমতা হাতছাড়া হয়ে যায়। অত কাঠখড় পুড়িয়ে যাওয়া আর আসাই সার! কথায় বলে না?  আসতে পাগল, যেতে ছাগল" 
"দিদি অমন বোলোনা। উনি সবজান্তা"
"কেন বাপু? মাসীর জন্যে দরদ উথলে উঠছিল তা আবার সেই দরদ বাষ্প হয়ে উবে গেল" 

আজ সকাল থেকেই বিমলিপিসি শুনতে পাচ্ছেন  কানাঘুষো। 

খোলকত্তাল নিয়ে সব জগন্নাথ, জগন্নাথ করতে করতে ভাবে বিভোর হয়ে পুরবাসীরা পথে নেমেছেন । তিন মক্কেলে মাসীর বাড়ি থেকে এই রওনা দিল বলে।
"মাসীর বাড়িতে এই কটাদিন খাওয়াদাওয়ায় খুব অনিয়ম হয়েছে...কাজের মেয়েটা উঠোন ধুতে ধুতে বলছিল। কে জানে, বদহজম, গ্যাস, অম্বল হল কিনা! কত করে বল্লুম, ডাইজিনের পাতাটা, জেলুসিলের বোতলটা সঙ্গে রাখ। তা ওনার দাদা বল্লেন, তুমি অত চিন্তা কোরোনা বৌদি। আমাদের কিছু হবেনা। জামার পকেট নেই। কোথায় নেব ওষুধপালা। আমি বল্লুম, এই মহাস্নানের পর জ্বরজারি থেকে উঠলে সকলে। তা আমার কথা শুনবে কেন?"
"যার বিয়ে তার হুঁশ নেই, পাড়ার লোকের ঘুম নেই ! কাজের মেয়ে অষ্টমীটা বলছিল,
"সকাল থেকে গুন্ডিচায় সাজো সাজো রব। তা বলি মাসীর বুঝি বোনপো, বোনঝিদের বিদেয় দিতে কষ্ট হবেনি?' 
" এত রমরম করে তাদের পাঠিয়ে দিচ্ছে ক্যান রে অষ্টমী?"   তা অষ্টমী বলল,
" মা, রথের ঝাড়াপোঁছা, সাজসজ্জা নিয়ে মত্ত লোকজন। হরিনামে মাতোয়ারা তারা। চন্দনবাটা, অগরুর সুরভিতে ম ম করছে পথঘাট"  
বিমলিপিসি বলল,
"তুই থামবি অষ্টমী? কাজগুলো শেষ কর আগে।ওরা এসে পড়ল বলে!  বলি এত‌ই যদি মাসীর আহ্লাদেপনা তা আর কটাদিন থাকতে পারলনা তারা? শরীরটা বিগড়ে গেলে তখন আর মাসী কোথায় ? তখন এই বিমলির কথা মনে পড়ে। আবার যত্ন-আত্যি করব, পথ্যি করে সারিয়ে তুলব তারপরে আর চিনতে  পারবেনা আমাকে।"   

অষ্টমী বললে,
"জানো মা? সেখানে পুজোর সব বাসনকোসন ঝকঝক করছে। তেনাদের রাজবেশ বিরাট ট্রাঙ্কে করে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে লোকজন। কেউ নারকোল কুরছে, কেউ ম্যাওয়া কুচোচ্ছে। দুধ ফুটে ঘন হয়ে ক্ষীর হচ্ছে। বড় বড় মাটির মালসায়  কলাপাতায় ভোগরাগ প্রস্তুত হচ্ছে গো । রথের মধ্যে ঘড়া ঘড়া জল ঢেলে সাফ করছে"  
বিমলা কি যেন বলতে যাচ্ছিলেন, আচমকা লক্ষ্মীমাসী এসে বল্লেন,
"দিদি, শূন্য এ মন্দির বেদীটা আর দেখতে ভাল লাগেনা গো। অপেক্ষায় আছি আমি। শুতে বসতে পারছিনা একমূহুর্ত। কেবল মনে হচ্ছে ঐ বুঝি রথ এল! কেন এমন হয় গো দিদি? এর নামই বুঝি বিরহ?'     
"আদিখ্যেতা করিসনি ছোটো। পাড়ার লোকেদের আদেখলাপনা আর ভাল্লগেনা আমার। পুষ্পবৃষ্টি করবে, কেওড়া, আতর, অগরু,কর্পূরের জল ফোয়ারার মত ছেটাবে তাঁর সব্বো অঙ্গে। নাচ-গান-ওডিশী নৃত্যের মধ্যে দিয়ে তাঁকে বিদায় দেবে, সারাক্ষণ  হাতপাখা দিয়ে বাতাস করবে, দোলায় করে দোলা দেবে, চামর দোলাবে, মাথার ওপর ছাতা ধরবে আর আমি বাপু জীবনে একটু যত্ন পেলুমনি! বেশ আছ বাপু তোমরা তিনটিতে মিলে। খাচ্চদাচ্ছ, লাইভ নাচাগানার প্রোগ্রাম দেখছ, এই বেশ হাওয়া বদল হল তোমাদের। আমার কথাটা ভেবেছ একবার? নিজেদের বেলায় আঁটিশুটি, আমার বেলায় দাঁতকপাটি। কেন একবার আমাকে নিয়ে যেতে নেই বুঝি মাসীর বাড়ি? সারাবছর মাসীটা খবর নেয়না, ঝিঙের বাড়িও মারেনা আর এঁরা ঐ মাসীর বাড়ি যায় ফূর্তি মারতে।'

লক্ষ্মীমাসী বলে উঠল, "এবার এলেই লিপিড প্রোফাইলটা চেক করাতে হবে দিদি। যে হারে মাখন, ননী খাচ্ছে এঁরা।" 
 বিমলিপিসি বলল, "যাবার আগে বলেছিলুম প‌ইপ‌ই করে। শুনলনা। এবার আসছে দুলকিচালে নাচতে নাচতে, আর আমার মাথাটা খেতে' 

- ঐ বুঝি রথ এসে গেল, দ্যাখ তো অষ্টমী।
বিমলিপিসির এই বয়েসেও মিনসেটার জন্য বুকের ভেতরটা কেমন জানি করে উঠছে। 
- কেন এমন হচ্ছে রে লক্ষ্মী? তোরও হচ্ছে নাকি? তারা গ্যাছে মাত্র আটদিন হল, আর মনে হচ্ছে আট বছর।
- দেখেছ তো দিদি, কেন ওরা মাসীর বাড়িতে অতদিন থাকেনা? এই তোমার জন্য, বুঝেছ? তোমাকে ছেড়ে উনি এক মূহুর্ত থাকতে পারেন না।
বিমলিপিসি মুচকি হেসে, ব্লাশ করতে করতে বলল,
- তাই?  তুই যেন সবজান্তা। 

Tuesday, May 3, 2016

স্বর্গীয় রমণীয় (১১)


কলের মধ্যে মোহর ভাগ বাঁটোয়ারার পর দেবর্ষি নারদ প্রস্থান করলেন । তারপর বহুদিন কেটে গেল। কেউ নারদের কুশল কামনা করেনা, খোঁজখবর নেয়না, ইমেইলে বার্তা বিনিময় করেনা দেখে তিনি হুল ফোটাতে উদ্যত হলেন। আকাশতলে, অনিলে, জলে ডিজিটালি কপি-পেষ্ট হল সেই বার্তা....হুলায়ন, হুলায়ন! সংসারে সকলে একযোগে বলে উঠল, নারদ, নারদ! ঐ বুঝি এল ঝড়। উল্টানো জুতোর পাটি সোজা করে মর্ত্যবাসী বলে উঠল, নারায়ণ, নারায়ণ! প্রত্যাদেশ হলে দেবর্ষি যেন এ পথ দিয়ে না যান।

গৃহবধূরা হেসে খলখল করে গড়িয়ে পড়ল... অত মোহর দিয়ে যদি শহরটা লন্ডন হত! আহা! ভোল পাল্টে যেত! কেউ বলল, না বাপু, লন্ডন হলে দেখো খুব পবলেম হবে! তাই তো আমি কলকাতাকে লন্ডন হতে দেবনা, কক্ষণো না! গঙ্গা আমার মা থাক্! তার আর টেমস হয়ে কাজ নেই।

কেউ বলল, আমাদের স্কুলজীবনে গরমকালের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল লোডশেডিং। তখন ইনভার্টার ছিলনা রোজ নির্দ্দিষ্ট সময়েই পাওয়ার কাটের পূর্বাভাস পেয়ে যেতাম আমরা। তখন আমাদের দখিণের খোলা বারান্দাই ভরসা। সেখানেই জ্যামিতি, পরিমিতি আর উপপাদ্যে নিয়ে জোর কসরত চলত আমাদের। সকাল থেকেই হ্যারিকেনে কেরোসিন ভরে, ঝেড়ে পুঁছে রেখে, তার সলতে ঠিকমত কেটে সমান করে দেওয়া হত ।তখনো গঙ্গার পাড় জুড়ে ছোটবড় মাঝারি কারখানায় বড় বড় তালা ঝোলেনি। এখন কলকাতা শিল্পহীন, বিদ্যুতের চাহিদাও নেই। কলকারখানাও নেই বড় একটা তাই লোডশেডিং মুক্ত দিন। ভাগ্যি শিল্প নেই নয়ত এইগরমে লোডশেডিং! ভাবতো বন্ধুরা! চুলোয় যাক্‌ শিল্প।

রাস্তার ধারে সারেসারে, থোকাথোকা আলো জ্বলে।
আলোর ঝলকে ঘুম আসেনা, তাই তো জেগে র‌ই !

এই দ্যাখো না রাত জেগে জেগে কেমন কবি হয়ে গেনু!

তাই দেখে আরেকজন সহচরী বলে উঠল, এই দ্যাখ, দ্যাখ, ফেসবুকে কেমন কবিতা লিখেছি!

এই আমরা বেশ আছি, খাচ্চিদাচ্চি, কলকলাচ্ছি।
ফ্যানের তলায়, এসির ঘরে, ফ্রিজের জলে, শরবত গিলে,
ঘন্টাখানেক সঙ্গে খবর , যুক্তিতক্কে কাটছে বছর ।
রেখেছো বাঙালী করে উন্নয়ন তো দেখোনি।
মাছেভাতে দুপুরঘুমে মানুষ তো আর হওনি।
শিল্পীপুজোয় বেজায় দড়ো, শিল্প কি তা বুঝবে বড়ো?
কেব্‌ল চ্যানেল হাজার হাজার, সোশ্যালনেটের গরম বাজার।
তার ওপরে পাওয়ারকাটম্‌? কক্ষণো নয় দারুণ গরম।

আরেকজন বলে উঠল, যাই আবার দেখি গিয়ে আমার পরিচিত কেউ নারদের হুলবিদ্ধ হলেন কিনা! মলম দিতে হবে। বড় জ্বালা হুলের বিষে। ছোটবেলার বিজ্ঞানে পড়েছিলাম ফার্ষ্ট এইডের কথা। ঠান্ডাজল, ক্যালামিনল, খাবার সোডা, এন্টিএলার্জিক। তাতেও না কমলে চালাও পানসি মোক্ষম দাওয়াই কর্টিকোষ্টেরয়েড লাগিয়ে দাও ভাই!

Friday, April 29, 2016

স্বর্গীয় রমণীয় (১০)

ই ডিজিটাল নারদ কিছুদিন আগেই এসেছিলেন আমাদের রাজসভায়। নির্বাচনী  প্রচার নিয়ে রাজমহলের অধিবাসীদের ব্যস্ততা তখন তুঙ্গে।  মহাভারতের ইন্দ্রপ্রস্থ না হোক বিধানসভার সভাপর্বে নারদকে সেভাবে কেউ স্বাগত জানালনা।  বিলাসব্যসনে তৃপ্ত আলোময় এইরাজ্যের মানুষেরা তাঁকে এতটুকুনি সমাদর করলনা?  নারদ গেলেন ক্ষেপে। তিনি শুরু করলেন হুল ফোটাতে। ঠিক যেমন মহাভারতের যুগে যুধিষ্ঠিরের উদ্দেশ্যে তিনি ছুঁড়ে দিয়েছিলেন প্রশ্নবাণ তেমনি দিলেন । কেন জানি এইরাজ্যে পা দিয়েই তাঁর মনে হয়েছে এখানে এই এত আলো, এত আকাশ, নাজানি মানুষের সুখ এখানে উপছে পড়ছে। সারেসারে ত্রিফলা আলো ও মধ্যে মধ্যে নীল-সাদা জুঁইফুল আলোর   আলোর রোশনাই দেখেই নারদের মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথকে। তিনি বলে ওঠেন 
"হঠাত আলোর ঝলকানি দেখে ঝলমল করে চিত্ত্" 

 ট্যুইট এল "নারায়ণ, নারায়ণ"

নারদ বললেন, এখন আর বলিনা ঐ মন্ত্র। এখন শুধু নৈরাজ্য দেখলেই বলে উঠি, হুলায়ন, হুলায়ন।  নিজের হাতের বীণার তারে বহুদিন বাদে টঙ্কার তুলে গাইতে শুরু করলেন


"এনেছি মোরা, এনেছি মোরা রাশিরাশি লুটের ভার " 

রাজ্যের লোকেরা বলল, কি লুট, কেন লুট? কবে হল লুট?
কেউ বলল, আহা! লুট হতে যাবে কেন? বোঝোনা?
নারদ বলছেন যখন নিশ্চয়‌ই হরির লুঠ।  

হরির লুঠ‌ই বটে।

হুলায়ন, হুলায়ন !

নারদ বললেন,  তোমাদের রাজ্যে সকলে কুশল তো? সকলে খেয়েপরে বাঁচো তো? সকলের ঘরে শিশুরা শিক্ষা পাচ্ছে তো? স্বাস্থ্য পরিষেবা কেমন এখানে? 
ডাইনে বাঁয়ে এত উড়ালপুল নির্মীয়মান এ রাজ্যে। অথচ দিনেদুপুরে সেই উড়ালপুল ভেঙেও পড়ে যায়। ভদ্রমহোদয়গণ, আমার প্রশ্ন পূর্ণিমার চাঁদ যে শহরের আলোর রোশনাই দেখে মুখ লুকায় তেমন আলোকনগরীতে কি এটা কাম্য? 
কন্যাসন্তানদের শিক্ষার প্রসারে প্রত্যেক ছাত্রীর উচ্চশিক্ষায় এককালীন পঁচিশহাজার টাকা বরাদ্দ হয়েছে জেনে যারপরনেই প্রীত হয়েছি। কিন্তু অধিকাংশ কন্যাদের ব্যাঙ্ক একাউন্টে সেই টাকা এখনো পৌঁছায়নি জেনে আশ্চর্য হলাম। আর গাঁয়েগঞ্জে তো সেই টাকা দিয়ে কন্যার পিতা বিবাহের পণ দিচ্ছেন। এহেন পরিকল্পনার কি ভবিষ্যত? 
সারা রাজ্য জুড়ে  দেখি নতুন নতুন সাইকেলে ছাত্রছাত্রী মাঠঘাট চষে ফেলছে। অলিগলিতে সাইকেল চড়ে প্রেম করে বেড়াচ্ছে তারা। এতো দেখি শিক্ষার জন্য সাইকেল পেলাম টাকডুমাডুমডুম!
আর দুটাকা কিলো চালের কি হাল জানো তোমরা? চালের মধ্যে অর্ধেক কাঁকর, অর্ধেক চাল। সেই চাল ফোটাতে জ্বালানী ফুরায়। এতো দেখি ঢাকের দায়ে মনসা বিক্রির জোগাড়।  

এইসব দেখতে দেখতে কলিযুগ সত্যযুগ কিনা তা পরখ করবার উদ্দেশ্যে নারদ একবস্তা মোহর নিয়ে হাজির হলেন মর্ত্যে।এবার খবর  রটে গেল, তিনি নাকি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আবির্ভূত হয়েচেন তাই সঙ্গে এত ধনসম্পত্তি তাঁর। কেউ ভাবল ধনপতি কুবেরের বাড়ি থেকে ফিরেছেন বলে এত ধনোপার্জন হয়েছে তাঁর।তাতে অবিশ্যি রাজমহলের কারোর হেলদোল হলনা। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে অর্থের প্রতি মর্ত্যবাসীর লোভ সম্পর্কে দেবকুল অতীব সচেতন।  অর্থ হল অর্থ। তা আবার যদি স্বেচ্ছায় কেউ দান করতে সম্মত হন তাতে দোষের কি?  দেবর্ষি নারদ মোহরের থলি নিয়ে সাংবাদিক বৈঠক ডাকতে প্রস্তুত হতেই ঝাঁকেঝাঁকে মধুমক্ষীর মত রাজ-অমাত্যগণেরা হাজির হলেন সেখানে। নারদ ভাবলেন...অর্থ অতি বিষম বস্তু! এইবেলা দ্যাখো, রাজকার্য ফেলে সকলে ঐ থলির মোহরের মোহে ছুটে এসেছেন। এদ্দিন আমার কোনো খোঁজ কেউ রাখেনি। এঁরা কেউ একটা ই-মেইলের সৌজন্যমূলক উত্তর দেওয়া তো দূরের কথা আমার ওয়েবপেজে নিদেন একটা মন্তব্য, কিম্বা ভালোলাগার কথাও জানাননি। আর আজ দ্যাখো টাকার কথায় সকলেই আমাকে  চাইছে।রাজামশাই অবিশ্যি মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন। কারণ তিনি আটঘাঁট বুঝে চলেন। সাদা কাপড়ে কাদা লেগে যাওয়ার চান্স শতকরা ১০০ ভাগ। চ্যালাচামুন্ডারা পেলে তিনি পাবেননা তা হয়না।  মনে মনে ভয়ও যে ছিলনা তা নয়। কারণ আসন্ন নির্বাচনে কালি লেগে ভাবমূর্তি নষ্ট হয়ে গেলেও বিপদ আবার নির্বাচনী প্রচারে প্রচুর অর্থেরো প্রয়োজন।  অগত্যা নারদ‌ই সহায়। নারদ‌ই গৌরীসেন। "তোমরা আমাদের মোহর দাও, আমরা তোমার কাজে লাগব" এই নীতিতে বিশ্বাসী হয়ে সব দুঁধে রাজমন্ত্রীরা নারদের মোহরের থলি থেকে একে একে প্রচুর মোহর পেলেন। 

Monday, April 25, 2016

স্বর্গীয় রমণীয়(৯)

ত্রিভুবন ঘুরতে ঘুরতে দেবর্ষি নারদ একদিন মহাভারতের পান্ডব রাজসভায় আসেন।পান্ডবগণ যথোচিত মর্যাদায় নারদমুণির অভ্যর্থণা করলেন। নারদের সেখানে আগমনের কারণ ছিল রাজনীতি বিষয়ক।  দেবর্ষি রাজার উদ্দেশ্যে একগুচ্ছ প্রশ্নবাণ ছুঁড়ে দিলেন। 
তিনি পান্ডবদের প্রশ্ন করলেন রাজাগণ কেবল অর্থচিন্তাতেই কালাতিবাহিত করছেন কিনা সেই নিয়ে। অর্থচিন্তার কারণে ধর্মচিন্তায় তাঁদের অনাসক্তি যেন না জন্মে এই ছিল নারদের চিন্তা। তিনি আরো বললেন, অর্থচিন্তাতো থাকবেই কিন্তু সেইসাথে রাজ্যের উন্নতিকল্পে বিবিধ উন্নয়নমূলক ক্রিয়াকর্মাদি যেমন, সেতুনির্মাণ, দুর্গনির্মাণ, পৌরকার্য্যাদি, জনপদ রক্ষণাবেক্ষণ...এইসব ঠিকমত সম্পাদিত হচ্ছে তো? কৃষি-বাণিজ্য-শিল্প-শিক্ষা-স্বাস্থ্যখাতে ঠিকমত অর্থাদি ব্যয় হচ্ছে তো? রাজ্যের কোষাগারে আয়ব্যয়ের হিসাবপত্র ঠিকমত রাখা হচ্ছে তো? তার রাজ্য চালাতে গেলে রাজাকে অষ্টবিধ রাজকার্য সম্যকভাবে সমাধা করতে হয়।  তিনি সে ব্যাপারে বেশ স্বচ্ছ তো? 

 রাজ্যের মঙ্গলার্থে শত্রু-মিত্র সকলের সহিত রাজা সুসম্পর্ক বজায় রাখেন তো? রাজার বাক্‌সংয্ম, বিনয় এবং অসূয়াপূর্ণ ব্যাবহার‌ই কিন্তু রাজ্যের উন্নতির জন্য অবশ্য কর্তব্য।   রাজা যেন কেবলি স্বার্থপরের ন্যায় তাঁর উপকারে লাগে এমন ব্যাক্তির সংসারের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেন। যুদ্ধে শত্রুপক্ষের দ্বারা ভীত, ক্ষীণবল মানুষজনের পাশে থাকাটাও তাঁর অবশ্য কর্তব্য। রাজকোষাগারের অর্থ কি রাজার ইচ্ছায় নয়ছয় হয়? শিল্পীমহল, বণিক সম্প্রদায় ও ঠিকাদারগণই কি  রাজতোষণ করে সমস্ত অর্থের সিংহভাগ লুটেপুটে নেন? হে রাজন্‌! আপনি কি তার হিসাব রাখেন? বৃদ্ধ, দরিদ্র, কৃষক, আশ্রিত, অনাথ ব্যাক্তিবর্গ কি সেই অর্থের ছিটেফোঁটাও ভোগ করেন না? রাজ্য মধ্যে মধ্যে নগর উন্নয়ন এবং পরিবেশ দূষণ রোধে বড় বড় পুষ্করিণী খনন হয়েছে কি? কৃষিকার্য মৌসুমীবায়ু নিরপেক্ষ হয়ে  সম্পন্ন হয়েছে কি? পৌরবর্গ ও জনপদবাসীর সঙ্গে আপনার বিরোধ নেই তো? আমি যতদূর জানি, রাজা নাস্তিকতা, অমৃতপান, নিদ্রা, কলহ, ক্রোধ , নিরন্তর অর্থচিন্তা, দীর্ঘসূত্রতা ইত্যাদি চৌদ্দটি রাজদোষ বর্জন করে রাজ্যাভিষেকের কালে শপথ নিয়ে সিংহাসনে বসেছিলেন। কিন্তু তা কি তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন? 
যুদ্ধিষ্ঠির এতক্ষণ একটুও অস্থির না হয়ে শুনছিলেন দেবর্ষি নারদের প্রশ্নগুলি। নারদ থামলে তিনি বললেন, হে দেবর্ষি! আপনি এতক্ষণ যে ধর্মনিচয় প্রশ্নগুলি আমার উদ্দেশ্যে নিক্ষেপ করলেন তা অত্যন্ত ন্যায়সম্মত। আমি সাধ্যানুযায়ী আমার রাজ্যের কল্যাণে যতটা পারি পালন করে থাকি।    কিন্তু তবুও কিছু কিছু সত্কার্যের মধ্যে অঘটনস্বরূপ  সামান্য দোষ হয়েও যায়। এজন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। দেবর্ষি নারদ যারপরনেই খুশি হয়ে রাজা যুধিষ্ঠিরকে  বললেন, এযাবতকাল বহু স্থান পর্যটন করতে  গিয়ে বহু  রাজন্যবর্গের সহিত সাক্ষাত ও তাঁদের অনিন্দ্যসুন্দর  রাজসভা  পরিদর্শণ হয়েছে। কিন্তু আপনার মত রাজা আমি দেখিনি। আপনি সত্যি‌ই ধর্মরাজ।

অথ মহাভারত (সভাপর্ব) সমাপ্ত।

"বেশ হালকাভাবে নিলেন তো ব্যাপারটা! সত্যি আপনার ন্যায় স্থীতধী রাজা বিরল" নারদ ভাবলেন।
পাশ থেকে এক যেন ফিসফিস করে বলে উঠল,
" জানোনা তো? রাজ্যপাট চালাতে গেলে প্রচুর বুদ্ধির প্রয়োজন। মহারাজ যুধিষ্ঠির খুব ভালোভাবেই জানেন এসব রাজনৈতিক কূটকাচালী কি করে হ্যান্ডেল করতে হয়। কথায় কথা বাড়ে। কেঁচো খুঁড়তে খুঁড়তসাপ বেরিয়ে আসতে পারে! অতএব মৌনতাই সদ্‌বুদ্ধির লক্ষণ"

Thursday, April 21, 2016

স্বর্গীয় রমণীয় ( ৮)

 ব্রহ্মার বিষ্ণুভক্ত ছেলেটি ছিল আমাদের সমাজের গেজেটের মত। পৃথিবীর কোণা কোণা থেকে খবর সংগ্রহ করে, "নারায়ণ, নারায়ণ" বলে সরল স্বরে যত্রতত্র হাজির হত। আর সেই ঘটনায় আরো রং চড়িয়ে খবরকে আরো মশলাদার করে  সে এমনভাবে পরিবেশন করত যে ঝগড়া বাধতে বাধ্য।সে না থাকলে পৃথিবীতে সাংবাদিক শব্দটির বুঝি উদ্ভব হতনা। এই সুদর্শণ ছেলেটির নাম নারদ।আর নারদ‌ই সম্ভবতঃ তিনভুবনের আদিমতম সাংবাদিক। সে ছিল তুখোড় গল্প বলিয়ে। 

সে যাইহোক আমাদের দেশে এই ছেলেটি কালেকালে তার  শৈশব, কৈশোর, যৌবন গুলে খেয়ে নারদমুনি নামে যুগযুগ ধরে বাস করছেন। তবে বৃদ্ধ হলে কি হয় তার স্বভাব যায়না । লোকজনের সঙ্গে ঝগড়া বাধিয়ে দিতে তার জুড়ি এখনো আর কেউ নেই।তাই বলে এই ঝানু সাংবাদিকটির বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ পায়নি।  সমাজের ভালোর জন্যে যা করণীয় তার জন্য নিজের স্বার্থত্যাগ করতেও তিনি প্রস্তুত। তাঁর অনেক গুণ। নিজের রচনায় গান লিখে সুর করে তিনি অহোরাত্র গেয়ে বেড়ান। 

বহুকাল আগে নারদের একটি ঢেঁকি ছিল। সেটিতে চড়ে তিনি ঝাঁ করে স্বর্গ থেকে মর্ত্যে, মর্ত্য থেকে পাতালে চলে যেতেন।  এখন বয়সের ভারে কুব্জ ও ন্যুব্জ পন্ডিত প্রবর মহামুণি সঙ্গীতরত্নটি শারীরিকভাবে অক্ষম। তাই বৈদ্যুতিন মাধ্যম কাঁপিয়ে বেড়ান।  তাঁর অস্তিত্ব এখন অত্যন্ত দাপটের সঙ্গে প্রকট ডিজিটাল মাধ্যমে।

তাঁর মত ধড়িবাজ জার্নালিষ্ট যে কলমটিতে নোট লিখে রাখেন তাতে স্পেশ্যাল একফোঁটা ক্যামেরা লাগানো। তিনি যখন মন্ত্রীবর্গের সভাসমিতিতে চুপিচুপি সূক্ষ্মশরীরে প্রবেশ করেন সেখানকার বন্ধদুয়ার বৈঠকের  আলাপ-আলোচনা থেকে ক্রিয়াকলাপ  পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে  স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে রেকর্ডিং হয়ে ইউটিউবে আপলোড হয়ে যায়। তিনি এখন কিছুটা বয়সের কারণে মিতবাক্‌। তবে কলম ও ক্যামেরা তাঁর সঙ্গে সঙ্গে অহোরাত্র চলে এবং চলতেই থাকে। সময়ের দলিল অনুযায়ী সবকিছু ডেটা স্টোর হয়ে যায় তাঁর ক্লাউড ড্রাইভে ।কার্যকালে  তিনি একটি মাউসের ক্লিকেই সেই ডেটাকে ঘাড় ধরে নামিয়ে আনেন পৃথিবীতে। কারণ তিনি যে কলহপ্রিয় নারদ। ঝগড়া উসকে দিয়ে গোল বাধাতে তাঁর জুড়ি এখনো কেউ জন্মায়নি ।  তবে গোল বাধিয়ে নিজের আত্মতুষ্টির একটাই কারণ। নিজের রাজধর্মকে বাঁচিয়ে রাখা। সেই ট্র্যাডিশান এখনো চলছে.....  

Tuesday, April 12, 2016

স্বর্গীয় রমণীয় (৬)

অশোক-বাসন্তীষষ্ঠী ও নীলষষ্ঠী together এবছর !!

শোকষষ্ঠী বা বাসন্তীদুর্গাপুজো হয় চৈত্রমাসের শুক্লাতিথিতে। মহাদেবের নীলের পুজোর দিনটা বরাদ্দ চড়ক বা গাজনের দিনক্ষণ অনুযায়ী, বর্ষশেষের সংক্রান্তির আগের দিনে। প্রতিবছর এই নিয়ে দুগ্গার সঙ্গে শিবের বেশ ঠান্ডা লড়াই চলে। তা এবার সবকিছুর অবসান ঘটিয়ে বাসন্তী-অশোকষষ্ঠী আর নীল একদিনে পড়েছে। শিবের ফন্দী আর কি দুগ্গার জানা নেই? দুগ্গা একটু বাপেরবাড়ি আসতে চান নিরিবিলিতে কিন্তু এবার সেই গাঁটছড়া বেঁধে নেশাখোরটা সঙ্গী হল।
আসার পথে দুগ্গা বলেছিল একবার, এবার ভোটের হাওয়া গরম, বোশেখ না পড়তেই হাওয়াবাতাস গরম। তুমি চুল-দাড়ি-জটা-গোঁফ কেটে চলো। শিব বলল, আমি মেয়েছেলের কথায় কান দি‌ই না।
দুগ্গা বলল, ক'দিন আগেই তো ঠান্ডায় ঠান্ডায় শিবরাত্তিরে মহা ধূমধাম করে কত্ত পুজো পেলে । ফাগুনদিনের মাগ্যির বেলের পানা, তরমুজ, ফুটি খেয়ে পথ্যি করলে। সিদ্ধি-মধু-ঘিয়ের ফেসপ্যাক নিলে । ডাবের জলে মুখ আঁচালে । ঠান্ডার পর নতুন গরমে টক দৈয়ের ঘোল খেয়ে ব্যোম্‌ ব্যোম্‌ করে ত্রিভুবন শান্তি কল্লে । মাথা ঠান্ডা তো তোমার গুরু! আবার নীলষষ্ঠী ? ষষ্ঠী তো এতদিন জানতাম একবগ্গা মেয়েদের সম্পত্তি। এবার সেখানেও ভাগ বসালে তো আমাদের ব্র্যান্ড ডাইলুশান হয়।
শিব বলল, নিজের আত্মতুষ্টিতে বিভোর তুমি। জানবে কি করে প্রজারঞ্জনের মাহাত্ম্য?
আবার ষষ্ঠীর পেছনে নীল জোড়া কেন বাপু? ক‌ই আমরা তো লাল,সবুজ, হলুদ ষষ্ঠীর দোহাই দি‌ই না মানুষকে।
পাশ থেকে সাওকড়ি মেরে নন্দী বলল, মা ঠাকরুণ তো ঠিক‌ই বলেচে বাবা।
নীলষষ্ঠী নীল কেন ? লাল বা সবুজ নয় কেন?
নীল কথাটি নীলকন্ঠ মহাদেবের সাথে সাযুজ্য রেখে... এতদিন আমার কাছে আচিস এটাও জানিস নে? মহাবাবা বলেন । সেই যে সেই সমুদ্রমন্থনের সময় আমি দুনিয়ার সব বিষ আমার কন্ঠে ধারণ করেছিলাম । তাই তো সকলে আমাকে নীলকন্ঠ বলে ডাকে রে ।
তার সঙ্গে ষষ্ঠী জুড়লো কে বাবা ? নন্দী বললে
তাহলে শোন্‌ বলি:
এক বামুন আর বামনীর পাঁচছেলে আর দুটি মেয়ে । ( ফ্যামিলি প্ল্যানিং তো আর ছিলনা সে সময়ে )
তারা খুব পুজোআচ্চা করত । কিন্তু এত পুজো, বারব্রত করেও তাদের সব ছেলেমেয়েগুলো একে একে মরে গেল । তখন বামনীর ঠাকুরদেবতায় বিশ্বাস চলে গেল । তাদের আর সেই জায়গায় থাকতেও ভালো লাগল না । বামুন-বামনী ঠিক করল সব ছেড়েছুড়ে তারা মনের দুঃখে কাশীবাসী হল । দশাশ্বমেধ ঘাটে স্নান করে অন্নপূর্ণার পুজো করে মণিকর্ণিকার ঘাটে বসে আছে , এমন সময় মা-ষষ্ঠী বুড়ি এক বামনীর বেশে এসে বললে " কি ভাবছ গো মা?" বামনী বললে " আমার সব ছেলেমেয়েদের হারিয়েছি । এত পুজোআচ্চা সব বিফলে গেল আমাদের । সব অদৃষ্ট। ঠাকুর দেবতা বলে কিছ্ছু নেই । "
ষষ্ঠীবুড়ি বললেন " বারব্রত নিষ্ফল হয়না মা, ধর্মকর্ম যাই কর ঈশ্বরে বিশ্বাস চাই । তুমি মা-ষষ্ঠীকে মানো? তাঁর পুজো করেছ কখনো? তিনি সন্তানদের পালন করেন । বামনী বললে " আমি এযাবতকাল সব ষষ্ঠী করে আসছি কিন্তু তবুও আমার ছেলেরা র‌ইল না ।
ষষ্ঠীবুড়ি বললেন্" তুমি নীলষষ্ঠীর পুজো করেছ কখনো? চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন উপোস করে শিবের পুজো করবে । শিবের ঘরে বাতি জ্বেলে জল খাবে । সন্তান্‌দের মঙ্গলকামনা করবে" (স্পিরিচ্যুয়াল গুরুদের ব্ল্যাকমেইলিংয়ের একটা লিমিট থাকে, তখন ছিলনা)
বামনী সেই কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে পুনরায় মাতৃত্ব লাভ করলে ।

নন্দী সব শুনে বললে" বাবা, এ তো তবে তোমার নিজের ব্র্যান্ড ক্রিয়েট করলে তুমি । আর সবষষ্ঠীর পুজোয়তো মাষষ্ঠীর পাল্লা ভারী হয়ে যাচ্ছিল তাতে যদি তোমার নামডাকে ভাটা পড়ে তাই বুঝি এমনটি কল্লে তুমি?"মহাবাবা বললেন " দেখ নন্দী, এখন যা যুগ এয়েচে তাতে নিজের ব্র্যান্ড যে মূল্যেই হোক ক্রিয়েট করতে হবে । নয়ত তুই স্থান পাবিনা জগতে , যা কম্পিটিটিভ মার্কেট এয়েচে! লাখলাখ দেবদেবীর ভিড়ে মহাদেবকে কেউ আর মানবেনা ।
আর এবার সেজন্যেই একসঙ্গে এসেচি আমরা। বাসন্তী-অশোক ষষ্ঠীও থাক। নীলষষ্ঠীও থাক। মানুষ জানুক রসায়নের জারণ-বিজারণের মত, পদার্থবিদ্যার স্থিতি-গতির মত শিব-দুগ্গার স্মরণ-মনন যুগপত ঘটে।

Wednesday, March 30, 2016

নানুরে বসন্ত এসে গেছে...

স্থানঃ নানুর, বীরভূম
কালঃ বসন্ত
সময় কালঃ বর্তমান

চন্ডীদাস ডাক দিলেন  "রামীণী,  এই অবেলায়, হাওয়াবদলের সময় নদীর ঘাটে বসে কাপড় কাচলে যে ঠান্ডা লেগে যাবে তোমার ।  দিনের আলো নিবে এল যে....

" চলো প্রিয়তমা রামীণী, আর যে সয়না বিরহ আমার, মধুর হোক আজ যামিনী ।" 

সুন্দরী রামীণি  আলুলায়িত চুলের লক্‌স ভিজে হাতে পুঁছে বললে,

যাই গো যাই !  কাপড় কেচে যেটুকুনি পাই, কোনোরকমে পেট চলে, তা কি তোমার জানা নাই ?

চন্ডীদাস বললেন, সে তো ভালো করেই জানি....

আমার মত অধম স্বামী, একটিও কাব্যমালা বেচতে পারিনা আমি ।

রামীণির ভিজে আঁচল । কাপড় কেচে কেচে পায়ে হাজা । কাপড়কাচার পাটার ওপর থেকে কাপড়কাচার ব্রাশ ,উজালার কৌটো, রিভাইভ, আলা ইনস্টোব্লিচ, ভ্যানিশ লিক্যুইড আর শীতপোষাকের জন্য ফেব্রিক ফেন্ডলি ইজি জেন্টল ওয়াশ।   ডাঁইকরা সদ্য কাচা ভিজে কাপড় দেখিয়ে চন্ডীদাসকে বললে, একটু নিঙড়ে দাও বাপু, হাতের কবজিতে আর জোর পাইনে।  চলো গিয়ে মেলে দি, ঐ জামাকাপড়,  ধোবিঘাটের ঐ লাইনে ।

চন্ডীদাস আড়চোখে দ্যাখেন রামীর ঢলঢল কাঁচা যৌবন । নিজেকে মনে হয় বড় পুণ্যবাণ ।  আগের বৌ ত্যাগ দিয়েছে অভাবের জ্বালায় । বাশুলীদেবীর থানে রামীকে নিজের পত্নী বলে মেনেছেন ।   এখন রামী তাঁর ধ্যান, রামী তাঁর বাগদেবী । প্রতিটি রাতের  অপেক্ষা । নতুন নতুন কামকলা।   আর রামীর অণুপ্রেরণায় চন্ডীদাসের রোজ নতুন নতুন কবিতা লেখা..... 


এদিকে কবিতার পান্ডুলিপি  সংবাদপত্রের দফতরে জমা পড়ে গেছে অনেকদিন   । কিন্তু দফতর থেকে কোনো উচ্চবাচ্য নেই । আর চন্ডীদাসের কাছে না আছে সেই পান্ডুলিপির প্রতিলিপি না আছে কোনো যোগাযোগের মাধ্যম । স্বয়ং উপস্থিত হয়ে  জেনে আসতে মানে লাগে তাঁর । দফতরের ইমেল জানেনা, ফোন নম্বর জানেনা সে ।   অথচ সংবাদপত্র ত পাঠিয়েও দেননি সেই কাব্য সম্ভার । অতঃপর নিজেই গেলেন লাজলজ্জা সম্বরণ করে । তাঁরা জানালেন কাব্যের বিনিময়ে তো বহুদিন পূর্বেই  তাঁকে ভূমি, জীবিকা এবং নানাবিধ উপহারে ভূষিত করেইছেন তিনি । কিন্তু চন্ডীদাস বললেন কিন্তু আমার পুঁথিটির কি হবে? তার স্বত্ত্ব কার থাকবে ? আর কেই বা সে পুঁথির প্রচার করবে ? মানুষ জানবেনা সেই অমূল্য পদ রচনার সুললিত কাব্যমালা ?

সংবাদপত্রের আধিকারিক বললেন "আপনার কাব্য সত্যি খুব সুন্দর, মন আর প্রাণ এককরে রচিত। অপূর্ব ছন্দমাধুরী পদের । কিন্তু কৃষ্ণ যে আপনার হাতে কলঙ্কিত, লম্পট এক ব্যক্তিত্ত্ব । মূল ইতিহাসকে যা বিকৃত করে, ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত হানে ।" 


চন্ডীদাস আহত হয়ে বললেন তাঁর পদসম্ভার ফিরিয়ে দিতে ।


সংবাদপত্রের আধিকারিক বললেন "এত বড় আস্পর্ধা? ঐ পুঁথির কথা ভুলে গিয়ে নতুন পদ রচনা করুন।আমাদের কাছে গচ্ছিত থাক ওটি। আর যদি ভরসা না থাকে নিয়ে যান আপনার ঐ সব বস্তাপচা পদ সম্ভার! আরো রগরগে করে পদ লিখুন মশাই! পাবলিক খাবে তবে!" 
অসহায় চন্ডীদাস ফিরে এলেন রিক্ত হাতে । 

 ...................................................... সেই সমাচার অব্যাহত । সেই ট্র্যাডিশান চলে আসছে যুগ যুগ ধরে । 


Saturday, February 13, 2016

স্বর্গীয় রমণীয় (৭)

তিনি আজো একটি ব্র্যান্ড--সরস্বতী  

তিনি নদীই হোন বা দেবী  তিনি আমাদের কাছে পূজনীয়া সর্বশুভ্রা সরস্বতী । নদী বা দেবী কিম্বা  দুটোই ভেবে নিয়ে আমরা সরস্বতীর পায়ে বছরের পর বছর চোখ বুঁজে ফুল ছুঁড়ে আসছি  ।  কিন্তু যদি ভেবে নিই তিনি আমাদের মধ্যে কোনো একজন মেয়ে তাহলে সমাজের স্তরে স্তরে এমন মেয়ের গল্প কিন্তু আমাদের খুব চেনাজানা ।

এমন  গল্প ভাবিয়ে তোলে আজো যেখানে সরস্বতী নামের মেয়েটি  পুরুষের লালসার স্বীকার হয় একাধিকবার । সেই সমাজের  শক্তিমান পুরুষদের সম্ভোগ লালসার টানাপোড়েনে বিপর্যস্ত হয়ে যায় মেয়েটির জীবন । তবুও সে ক্ষতবিক্ষত হয়ে বেঁচে থাকে । অব্যাহত থাকে তার লড়াই। চলুন সেই  কিম্বদন্তীর কড়চা খুলি আধুনিক ভাবে।


 কোনও এক সময়…

একদিন  ব্রহ্মার তলব তাঁর মেয়ে সরস্বতীকে । সে মেয়ে তখন নদী। উঠে এল পাতাল থেকে। বাপের চাহনি সুবিধের নয়, তা মেয়ে জানত। বাপ বলল,

-এবার তোমাকে আমার কাছে সর্বক্ষণ থাকতে হবে, এ আমার আদেশ ।

মেয়ে বলল, কারণটা কি শুনি? বাপ বলল, আমি তোমার জলে ত্রিসন্ধ্যা গায়ত্রী জপ করব।

মেয়ে বলল, মামদোবাজি পেয়েছ? বুড়ো ভাম একটা। ঐ পুজোর ছুতোয় আবার আমার গায়ে হাত দেবে? আমি পুরুষদের থেকে সর্বদা দূরে দূরে থাকতে পছন্দ করি।

– সব পুরুষ আর আমি বুঝি এক হলুম?

মেয়ে বলল, আমি কি আর জানিনা? তোমার চারটে মাথা, আটটা চোখ, সর্বদা ঘুরছে আমার পেছন পেছন।

–  মনে রেখো তুমি আমার মেয়ে।

সরস্বতী গর্জে উঠে বলল, তো কি, তাহলে জেনে রাখো তোমার জন্যেই বিশেষতঃ আমি পাতালে থাকি।

মেয়েটা তখন ছুটল মহাদেবের কাছে।

-ঐ দ্যাখো, শিবুকাকা! বুড়োটা কি বলে! বলে কিনা আমাকে ভোগ করবে।

-হ্যাঁ, বলিস কি রে? ব্যাটা বুড়ো , বাপ্‌ হয়ে তোর দিকে নজর দেয়? শিবুকাকা মানে মহাদেব বললেন।

-জানো? ঐ যে তোমাদের স্বর্গের দালাল? কি যেন নাম? হ্যাঁ, মদনবাবুকেও বলছিল চুপি চুপি, আমি শুনেছি সে কথা….” মদন কিছু করো, এই সুন্দরী কন্যার প্রতি সম্ভোগ লালসা রূপায়িত হচ্ছেনা যে ”

-বলিস কিরে? এত বড় স্পর্ধা! এই সেদিন করে সভায় বড়মুখ করে ব্রহ্মা বলল, ” ঠিক যেমন গ্রিক দেবী কুমারী এথেনা পিতা জিউসের কপাল থেকে নির্গত হয়েছিলেন, আজ থেকে আমারও মানস কন্যা এই মেয়েটির নাম দিলাম সরস্বতী ”  আর আজ সে তোকে কামনা করছে?  এড়িয়ে চল, পালিয়ে যা মা!

সরস্বতী বলল,

-কোথায় যাব? তাঁর দুষ্ট দৃষ্টি যে সর্বদা আমাকে চোখেচোখে রেখেছে। নিস্তার নেই আমার।

মহাদেব বললেন,

-তবে রে? দাঁড়া, ঐ কামদেব মদনকে আগে ভস্মীভূত করি! ব্যাটার দালালি করা বের করছি আগে।  ব্রহ্মা ভেবেছেটা কি তার পেশীর জোর আমার থেকেও বেশী? এবার দ্যাখ, কে বেশী শক্তিমান। কার কত বাহুবল?

সরস্বতী বলল, বাঁচালে শিবুকাকা! তুমি‌ই আমার সত্যিকারের পিতাশ্রী।

আবার দিন-কয়েক পর….
 ব্রহ্মা গেলেন ক্ষেপে। সরস্বতীকে তেড়ে গিয়ে তার প্রতি খুব দুর্ব্যবহার করে বললেন, তবে রে? আমি তোর কে ভুলে যাসনিরে মেয়ে।

মহাদেব তখন শরবিদ্ধ করে ব্রহ্মাকে হত্যা করলেন। তখন ব্রহ্মার পত্নী গায়ত্রী কন্যা সরস্বতীকে নিয়ে স্বামীর প্রাণ ফিরিয়ে আনার জন্য গন্ধমাদন পর্বতে তপস্যা শুরু করেন। তাঁদের দীর্ঘ তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে শিব ব্রহ্মার প্রাণ ফিরিয়ে দেন।

আবারো কোনও একদিন…

বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির সময় অগ্নির করাল গ্রাসে সৃষ্টি প্রায় ধ্বংসের মুখে তখন সেই  বিপর্যয়কে রুখতে দেবরাজ ইন্দ্র গেলেন নদী সরস্বতীর কাছে…. ।

– সুন্দরী, কি অপরূপ লাবণ্যময়ী তুমি! তোমার নরম চাহনি, তরঙ্গায়িত, সুললিত শরীর, একটু জল দেবে?  প্রচুর জল চাই, প্রাণ ভরে দিতে পারবে তোমার জল?

সে মেয়ে ভাঙে তবু মচকায় না। পারলে চ্যালাকাঠ নিয়ে তাড়া করে ইন্দ্রকে। তার ছলাকলা বুঝতে বাকী নেই। স্বর্গে তার খুব নাম খারাপ। মেয়েছেলে দেখলেই সে ছোঁকছোঁক করে! মনে মনে ভাবল সরস্বতী।

– আমি কি বুঝিনা তোমার দুরভিসন্ধি? আসল কথা বলো!

ইন্দ্র বলল,

– পালাবে আমার সাথে?  সরস্বতীকে তার গতিপথ পরিবর্তন করে আগুন নেভাতে আদেশ দিল ।

সরস্বতী  ইন্দ্রের মতলব বুঝতে পেরে  তখন সমুদ্রের দিকে ধাবমান ।

সে বলল,

– বাপু তুমিও সুবিধের নও।  ব্রহ্মা স্বয়ং আদেশ দিলে তবেই সেই আগুন নেভাতে আমার  গতিপথ ঘোরাব । কিন্তু তোমার সাথে যাবনা।

অবশেষে ব্রহ্মার অনুরোধে সরস্বতী সম্মত হল । গঙ্গা, যমুনা, মনোরমা, গায়ত্রী ও সাবিত্রী এই পাঁচ নদী তার সঙ্গ নিতে চাইল কিন্তু সরস্বতী একাই গেল সেই অগ্নিনির্বাপণ কাজে । নিজে ক্রেডিট নেবেন তিনি। নিজের ব্র্যান্ড তৈরি করতে হবে। আরও পাঁচজন সাথে থাকলে ব্র্যান্ড ডাইলুশ্যান!  যাই বল সরস্বতী ব্র্যান্ড নিঃসন্দেহে জবরদস্ত ।

পথে ক্লান্ত হয়ে ঋষি উতঙ্কর আশ্রমে বিশ্রাম নিতে গেল সরস্বতী আর তক্ষুনি মহাদেব বললেন

– কি রে মেয়ে? এত ঘুরিসনা। অত ধকল কি মেয়েছেলের সহ্য হয়? আবার পথে বিপদ হতে পারে। যা সব বদমায়েশ লোকজন পথেঘাটে!

নে এবার আগুণ নিভিয়ে দে তোর জল দিয়ে। আমি তোর সুবিধের জন্য সমুদ্রাগ্নিকে একটি পাত্রে ভরে  নিয়ে এসেছি ।

সরস্বতী তখন উত্তরে ব‌ইতে শুরু করল । ভারতের উত্তরপশ্চিমে পুষ্করে গিয়ে তার দ্বিতীয় বিশ্রাম হল । যার জন্য পুষ্কর হ্রদ হল এখনো একটি তীর্থক্ষেত্র ।

অন্য কোনদিন…

আবারো স্বর্গে দুই দাপুটে ঋষি, বিশ্বামিত্র ও বশিষ্ঠর কত অত্যাচার সহ্য করল এই মেয়ে। দুই ঋষির কি ছোঁকছোঁকানি এই সরস্বতীকে নিয়ে!  দুজনেই চায় এই মেয়েকে ভোগ করতে।

একবার ঋষি বশিষ্ঠ সরস্বতীর তীরে তপস্যায় মগ্ন ছিলেন । কাছেই বিশ্বামিত্রের আশ্রম। বশিষ্ঠ আর বিশ্বামিত্রে আদায়-কাঁচকলায়। দুজনারই ক্রাশ। দুজনারই টার্গেট সরস্বতী।

বিশ্বামিত্র এসে সরস্বতীকে বললেন

– বশিষ্ঠকে নিয়ে প্রচণ্ড বেগে  লণ্ডভণ্ড করে প্রবাহিত হও নয়ত খুব খারাপ হবে  , বলে দিলাম ।

সরস্বতী প্রথমে রাজী হননি । সে মনে মনে ভাবল,  নিশ্চয়ই কোনও মতলব আছে বুড়োর।

– আমি তো কারো ক্ষতি করিনা সাধু!তুমি কি চাও বল তো।

– আমি চাই ব্যাটা পাজি বশিষ্ঠ যেন আমার ত্রিসীমানায় না থাকে।

অবশেষে বিশ্বামিত্রের অনুরোধ উপেক্ষা না করতে পেরে দুকুল ছাপিয়ে ধ্যানমগ্ন বশিষ্ঠকে নিয়ে বানভাসি হলেন । নদীর ঢেউয়ের সর্বোচ্চ শিখরে ধ্যানমগ্ন বশিষ্ঠ । একবার উঠছেন আবার একবার নামছেন ঢেউয়ের দোলায় । বিশ্বামিত্র তো বেজায় খুশি । মনে মনে ভাবল, এদ্দিনে বশিষ্ঠ জলে ডুবে মারা যাবে আর সে তখন সরস্বতীকে পেয়ে যাবেই।   কিন্তু এই প্লাবনে বশিষ্ঠের কোনও হেলদোল নেই দেখে তাঁর একটু সন্দেহ হল । বিশ্বামিত্র বুঝলেন সরস্বতী বশিষ্ঠকে নিশ্চয়ই রক্ষা করছে । অতএব সরস্বতীর এইরূপ ছলকায় যারপরনেই অসন্তুষ্ট হয়ে বিশ্বামিত্র সরস্বতীকে অভিশাপ দিলেন ও সরস্বতী অচিরেই রক্ত রূপী নদীতে পরিণত হল । মুনি ঋষিরা যখন সরস্বতীর তীরে স্নান করতে এলেন তখন বিশুদ্ধ জলের পরিবর্তে রক্ত দেখে খুব আশ্চর্য হলেন । সরস্বতী তাঁদের কাছে কেঁদেকেটে সব কথা খুলে বললেন ও বিশ্বামিত্রের এহেন দুরভিসন্ধির কথাও জানালেন  । নিজের মুক্তি চাইলেন ও পুনরায় পূত:সলিলা সরস্বতী রূপে ফিরে চাইলেন নিজের জীবন । সেই দয়ালু মুনিঋষিদের প্রার্থনায় শাপমুক্ত হলেন সরস্বতী এবং পুনরায় বিশুদ্ধ হল নদীর জল । এই কারণে সরস্বতীর অপর এক নাম “শোন-পুণ্যা” ।

এবার দেখি সরস্বতী নামে আমাদের মেয়েটি কি সুখী বিবাহিত জীবন পেয়েছিল নাকি কদর্য এই পুরুষ শাসিত সমাজের প্রতি ঘৃণায়, লাঞ্ছনায় বিয়ের মত প্রহসনের দিকে পা বাড়ান নি ? না কি আজকের দিনের মত বিবাহ-বিচ্ছিন্নাই থেকে গেলেন আজীবন ?  না কি একাধিক সপত্নীর সাথে ঘর করার অসহ্য বেদনা বুকে নিয়ে পালিয়ে গেলেন এই পৃথিবী ছেড়ে ?

নাহ, তিনি পালিয়ে যান নি। পরাজিত হন নি । তিনি দাপটের সঙ্গে লড়ে গেছেন পুরুষের বিরুদ্ধে। যুদ্ধ করে গেছেন পুরুষের কামনার স্বীকার হতে হতে । কিন্তু বেঁচে রয়েছেন আজো মানুষের মনে কারণ তিনি জয়ী ।

কালের কপোলতলে…

বিষ্ণু ভাবছিলেন গঙ্গা, লক্ষ্মীর পর সরস্বতীর সাথে যদি ঘর বাঁধা যায়। অমন সুন্দরী, বিদুষীকে ঘরণী করলে মন্দ হবেনা। সরস্বতী তা বুঝতে পেরেই সমূলে বিষ্ণুর সেই প্ল্যানে কুঠারাঘাত করলেন। পুরুষের প্রতি তদ্দিনে তার ঘৃণা জন্মেছে। বিয়ের ফাঁদে আর নয়।

দুই স্ত্রী গঙ্গা আর লক্ষ্মীর মধ্যে বিষ্ণু গঙ্গার প্রতি একটু বেশিমাত্রায় আসক্ত ছিলেন । নম্রস্বভাবের লক্ষ্মী এই ঘটনায় মনে মনে খুব দুঃখ পেতেন কিন্তু কিছু প্রকাশ করতেন না । সরস্বতী কিন্তু বিষ্ণুর এই অতিরিক্ত গঙ্গাপ্রেমকে প্রশ্রয় না দিয়ে অশান্ত এবং রুষ্ট হয়ে উঠেছিলেন ।  একদিন তার মাথায় একটা বুদ্ধি এল ।  প্রচন্ড উগ্রমূর্তি ধরলেন তিনি ।

গঙ্গার মুখোমুখি হলেন ।

– শোনো গঙ্গা এটা কিন্তু ঠিক হচ্চেনা। তোমার স্বামী কিন্তু লক্ষ্মীরো স্বামী। সেটা মনে আছে তো?  লক্ষ্মী কেমন মনে মনে কষ্ট পায়, ডুকরে কাঁদে, তুমি দেখতে পাওনা?

লক্ষ্মী একটি ভয়ানক কলহের পূর্বাভাস পেয়ে সরস্বতী ও গঙ্গার মধ্যিখানে এসে দাঁড়ালেন । সরস্বতী লক্ষ্মীকে অভিশাপ দিয়ে একটি গাছে পরিণত করলেন । লক্ষ্মী আবার সেই অভিশাপে প্রচন্ড আঘাত পেয়ে সরস্বতীকে নদীতে রূপান্তরিত করলেন ।

সরস্বতী বললেন, যা বাবা, যার জন্যে চুরি করি, সেই বলে চোর?

সে নিজেও তখন উগ্রচন্ডা । নিজে নদীতে পরিণত হয়েছে বলে গঙ্গাকেও নদী হতে অভিশাপ দিল ।

ইতিমধ্যে বিষ্ণু সেইখানে হাজির হলেন । এতসব ঝগড়া বিবাদ দেখে ও শুনে স্থির করলেন সরস্বতী ও গঙ্গার সাথে আর নয় । এখন থেকে তিনি কেবলমাত্র লক্ষ্মীর সাথেই ঘর করবেন । সরস্বতীকে ব্রহ্মার হাতে এবং গঙ্গাকে শিবের হাতে সমর্পণ করে বিষ্ণু  হলেন লক্ষ্মীর প্রিয় পতিদেবতা । আর  সরস্বতী ও গঙ্গার ওপর এরূপ অন্যায় শাস্তির জন্য  লক্ষ্মী মনে মনে ব্যথিত হলেন আবার বিষ্ণুকে একান্ত নিজের স্বামীরূপে বরণ করে আনন্দিতও হলেন। বিষ্ণুকে শান্ত হতে বললেন এবং তাদের দুজনের আশীর্বাদে লক্ষ্মী ও গঙ্গা মর্ত্যের ওপর দিয়ে নিজ নিজ গতিপথে ব‌ইতে লাগল । স্বর্গে তাদের দুজনার একটি করে শাখা বিষ্ণুর হাত ধরে র‌ইল।

সে যুগে বিয়ের ফাঁদে আদৌ কি বাঁধা পড়তেন দেবদেবীরা ?   রক্তমাংসের সম্পর্কের মত দেবদেবীদেরও তো কৈশোরে বয়ঃসন্ধির সুবাদে দেহরসের ক্ষরণ ও সেই হেতু ছোঁকছোঁকানিও ছিল । ছিল ইভ-টিজিং ও মোলেষ্টশান । আর জিভ কেটে কানে হাত দিয়ে বলি দেব-দৈত্যকুলে রেপিষ্টের সংখ্যাও নিদেন কম ছিলনা সেযুগে । তারা লিভটুগেদার বা “থাকাথাকি’তে বিশ্বাসী ছিলেন না বিয়ের মত লিগাল ইনস্টিটিউশানে বিশ্বাসী ছিলেন সে তো পরের কথা সেক্স ও ভায়োলেন্স এর দাপট কিন্তু এ যুগের চেয়ে সেযুগে কিছু কম ছিলনা ।   সরস্বতী সাজগোজ , পোশাক-আষাকের মধ্য দিয়ে আর সর্বোপরি তাঁর গুণ, বুদ্ধি আর বিদুষী ব্যক্তিত্ত্বের দ্বারা পিতৃসম ব্রহ্মা থেকে শুরু করে প্রেমিক তুল্য নারায়ণের মাথাটা ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন । যাকে আমরা এখন শহুরে ভাষায় বলি “হেড টার্নার’ ; হতেই পারে । সমাজে এমন মেয়ের কদর তো হবেই যিনি একাধারে রূপসী আবার বিদুষী । পুরাণে বলা হয় সরস্বতী ছিলেন অসম্ভব ঝগড়াটে আর মেজাজ ছিল দাপুটে । হতেই পারে । যিনি একহাতে বশিষ্ঠ থেকে বিশ্বামিত্র আর অন্যহাতে ব্রহ্মা থেকে বিষ্ণুকে নাচাতে পারেন তিনি তো অযোনিসম্ভবা, অসামান্যা । কিন্তু আজকের সমাজের চিত্রটাও ঠিক তেমনি আছে অনেক ক্ষেত্রে ।

এমন সরস্বতী যেন বারবার ফিরে আসে আমাদের সমাজে নির্ভয়া, দামিনী বা আমানত হয়ে যাকে মনে রাখার জন্য বছরে একটি নির্দ্দিষ্ট দিন পালন করা হবে আর পূজা-পাঠ-অঞ্জলি-আরতি এ সব তো মনগড়া ! আসল তো সে মেয়ের ব্র্যান্ড যা যুগ যুগ ধরে মানুষের মনে দাগ কেটে দিয়ে যাবে ।   সে তো আমাদেরই ঘরের চেনা একটা মেয়ে অথবা শুধুই মেয়ে নয় দেবতা নিশ্চয় !!!